শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

ডেসটিন স্টাইলে প্রিসাইড গ্রিন সিটির চেয়ারম্যান মঞ্জু ফরাজী ভুমিদস্যুতা

ডেসটিন স্টাইলে প্রিসাইড গ্রিন সিটির চেয়ারম্যান মঞ্জু ফরাজী ভুমিদস্যুতা

স্টাফ রিপোর্টার:
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে অনুমোদন ছাড়াই ঝালকাঠির নলসিটি উপজেলায় ‘প্রিজাইড গ্রীন সিটি’ নামে একটি হাউজিং কোম্পানী গড়ে চরম ভুমিদস্যুতা সহ ডেসটিন স্টাইলে মহাপ্রতারনার ফাঁদ খুলে বসেছে মঞ্জু ফরাজী। ডেসটিন স্টাইলে অস্তিত্বহীন প্লটের শেয়ার ব্রিকয়, কৃষি জমি দখলের অভিনব কৌশল, এক প্লট একাধিক ক্রেতার কাছে বুকিং, টাকা নিয়ে প্লট বুঝিয়ে না দেয়া, সরকারী খাস জমি-নালা-ডোবা-জলাশয় দখলে নিয়ে বালু ভরাট এমনকি একজনের মালিকানাধীন জমিতে অন্যজনকে মালিক সাজিয়ে নিজেদের কোম্পানীর নামে রেজিষ্ট্রি করে নেয়া, কোম্পানীর এমডি কর্তৃক কোটি কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়া সহ নারী কেলেঙ্কারি ও আওয়ামী রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর মতো ভয়ঙ্কর কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং অনুমোদনহীন এই কোম্পানীটিকে মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে স্থানীয় প্রশাসন নিবর সহযোগিতা করে আসছে। চটকদার বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট করে গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। ডেসটিনি স্পেশালিষ্ট মঞ্জু ফরাজী খপ্পরে পড়ে একখণ্ড জমির আশায় সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব আজ হাজার হাজার ভুক্তভোগী পরিবার।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, বরিশাল শহরের দক্ষিণ-পূর্বে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে ও বরিশাল- পটুয়াখালী-কুয়াকাটা ও বরিশাল-ভোলা মহাসড়কসংলগ্ন নলসিটি ন্যাশনাল হাউজিংয়ের পাশে প্রিজাইড গ্রীন সিটি। কোম্পানীটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মঞ্জু ফরাজী এবং তার পার্টনাররা হলেন ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ নাহিম আকন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ কাজী, মার্কেটিং – ডিরেক্টর এস.এম. রফিকুজ্জামান, ডিরেক্টর হাফেজ মোঃ জাকির হোসেন, ডিরেক্টর মোহাম্মদ কাইয়ুম, ডিরেক্টর মোঃ অহিদুর রহমান প্রিন্স। এরা সবাই এমএলএম কোম্পানী ডেসটিনির প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত প্রতারক। অন্যের জমির উপরে কোম্পানীর প্লট দেখিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। কোটি কোটি টাকা নিয়ে ইতিমধ্যে পালিয়ে গেছে কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ কাজী। তবে চেয়ারম্যান মঞ্জু ফরাজী আবার আমির হোসেন আমুর দু:সম্পর্কের ভাতিজা। আমুর প্রভাব থাকায় মঞ্জু ফরাজীর ভুমিদস্যুতায় কেউ বাঁধা হয়ে দাড়াতে পারেনি। ফ্যাসিস্ট হাসিনার স্বৈরাচারী শাসন আমলে আমির হোসেন আমুর প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রতারক মঞ্জু ফরাজী কৃষকের জমি, সরকারী খাস জমি ও জলাশয় ভরাট করে প্রিজাইড গ্রিন সিটি নামের এই প্রজেক্টটি সাজিয়েছেন।
একটি বেসরকারী আবাসন প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করতে হলে অন্তত ২০/২২টি সরকারী কর্তৃপক্ষে অনুমোদন নিতে হয়। যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন অনুমোদন নিতে হয় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতীত যে কোন প্রকল্পের কার্যক্রমই অবৈধ এবং দন্ডনীয় অপরাধ। অথচ ট্রেড লাইসেন্স ও ইউপি চেয়ারম্যানে অনাপত্তি সনদ ছাড়া কোন কিছুই নেই প্রিজাইড গ্রিন সিটির নামে। এমন অনুমোদনহীন ভুমিদস্যু এই কোম্পানীটি এসিল্যান্ড, ইউএনও ও ডিসি অফিসের নাকের উপরে বসেই অন্যের জমি জাল-জালিয়াতি, দখল বানিজ্য, জলাশয়, কৃষি ও সরকারী জমিতে বালু ভরাট করে প্লট বানিয়ে বুকিংয়ের মাধ্যমে ১০/১২ বছর যাবৎ মানুষের নিকট থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এগুলো দেখেও কোন প্রতিবাদ করছে না সরকারের এই কর্তৃপক্ষ গুলো।

সুত্র জানায়, স্থানীয় জমির মালিদের অজান্তে শতশত একর কৃষি জমির উপরে প্লটের লে-আউট ডিজাইন বানিয়ে বড় বড় সাইনবোর্ড, চমকপ্রদ লিফলেট, বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচারনা চালানো হচ্ছে ফেসবুক ইউটিউবে। যেন দেশে আইন-কানুন বলতে কিছুই নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রিজাইড গ্রীন সিটির নামে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নিকট কোন হাউজিং কোম্পানির অনুমোদন নাই। তাহলে এই কিভাবে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। এর মুল কারন হলো আমির হোসেন আমুর ক্ষমতা। খুনী হাসিনার আমু বানিহীর কাধে বসে মঞ্জু ফরাজী চক্ররা সারা দেশটাকেই গিলে খেয়েছে। এদের সাথে কথা বলাই ছিলো চরম অপরাধ। প্রতিবাদ করাতো দুরের কথা।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (মার্কেটিং) এস. এম. রফিকুজ্জামান রফিক। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য- রফিক শুধু প্লট বিক্রিতেই নয়, সুন্দরী নারীদের ব্যবহার করে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবশালীদের তুষ্ট করার কাজও করেছেন। জমি দখল ও অস্ত্রসজ্জিত মহড়ায়ও নেতৃত্ব দিতেন। প্রকল্প এলাকার বহু মানুষের জমি জবরদখলের ঘটনাতেও তার নাম এসেছে। ৫আগস্টের পর কোম্পানীর সাথে কিছু বিএনপি-জামাতের নেতাকে যুক্ত করে অপকর্ম অব্যাহত রেখেছেন প্রতারক মঞ্জু ফরাজী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগীদের একজন নারী ক্রেতা জানান, পরিবারের সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে প্লট কিনেছিলেন তিনি। কিন্তু প্লট বুঝে না পাওয়ার পাশাপাশি অফিসে গেলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
জনকথার হাতে আসা অভিযোগপত্র ও সরকারি নথিপত্র পর্যলোচনা করে দেখা গেছে, খাস জমি দখল, একজনের জমিতে আরেকজনকে মালিক সাজিয়ে কোম্পানীর নামে রেজিষ্ট্রিশন নেয়া, একাধিক ক্রেতার কাছে একই প্লট বিক্রি এবং অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ার মতো অসংগতি প্রিজাইড গ্রীন সিটির বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
সুত্র জানা যায়, নলসিটি উপজেলার পূর্Ÿচর দপদপিয়া মৌজার ১৬১ ও ১৬৬ খতিয়ানের ৯৫.৫০ (সাড়ে ৯৫ শতাংশ) শতাংশ জমির রেকর্ডিয় মালিক মোকতার আলী ফকির। তিনি ও স্ত্রী মালেকা বেগমের মৃত্যুতে ওয়ারিশ সুত্রে মালিক তাঁর ছেলে মো. হাসমত আলী। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তাঁর জন্ম ১৯৪৫ সালের ৭ এপ্রিল। আইডি নম্বর ৪২১৭৩১৫৩৭৮০৭৭। গত ৩০ মে নলছিটি সাবরেজিস্ট্রার অফিস থেকে ১৪৬৪ নম্বর সাব কবলা দলিল রেজিস্ট্রি হয়। দলিলে হাসমত আলীর সাড়ে ৯৫ শতাংশ জমি ভুয়া একজন বিক্রেতা জাতীয় পরিচয়পত্র জাল তৈরি করে ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকায় বিক্রির একটি দলিল রেজিস্ট্রি করা হয় প্রিজাইড গ্রীন সিটি লিমিটেডের নামে। জাল জাতীয় পরিচয়পত্রে জমির বিক্রেতার নাম লেখা রয়েছে হাসমত ফকির। তাঁর বাবার নাম মোক্তার আলী, মায়ের নাম ফুল বানু লেখা। জন্ম তারিখ ১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি। আইডি নম্বর ৪২১৭৩১৫৩৯০২১৭। এসব দেখেও যাচাই বাছাই না করেই নলছিটির সাবরেজিস্ট্রার দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন। আবার সেই জমির নামজারীও করে দেন স্থানীয় এসিল্যান্ড।
জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা জাতীয় পরিচয়পত্রটি নলছিটি উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে যাচাই করা হলে কাঞ্চন হাওলাদার নামে এক ব্যক্তির বলে জানানো হয়। মূলত এই কাঞ্চন হাওলাদারের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ঠিক রেখে হাসমত ফকির নিজের ছবি, বাবা মায়ের নাম ও জন্ম তারিখ বসিয়ে জালিয়াতি করেন। সেই জাল জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়েই নলছিটি সাবরেজিস্ট্রি অফিস থেকে বরিশাল-পটুয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের কাছাকাছি ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছুটা দূরে সাড়ে ৯৫ শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করা হয় প্রিজাইড গ্রীণ সিটি লিমিটেড নামে একটি কোম্পানীর নামে। শুধু মো. হাসমত আলীর জমিই নয়, তাঁর বড় ভাই আবুদর রশিদ ফকিরের একই মৌজায় সাড়ে ৮৬ শতাংশ জমি মিনারা বেগম ও মাহামুদ ফকির নামে দুই বিক্রেতা জাতীয় পরিচয়পত্র জাল তৈরি করে ২১ লাখ ৬৫ হাজার টাকায় বিক্রির একটি দলিল রেজিস্ট্রি করা হয় প্রিজাইড গ্রীন সিটি লিমিটেডের নামে।

হাসমত আলীর ছেলে মেহেদি হাসান অভিযোগ করেন, আমার বাবার জমি। তাঁর আইডিকার্ড (জাতীয় পরিচয়পত্র) জাল করে অন্য লোক সাজিয়ে দলিল করে বিক্রি করে নেয়। আমার চাচার জমিও জালিয়াতি করে নিয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে দলিল লেখক, সাবরেজিস্ট্রার ও প্রিজাইড সিটির চেয়ারম্যান মঞ্জু ফরাজীরা সবাই জড়িত। আমাদের জমি আমাদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

Facebook Comments Box