ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) আবাসন নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে আবারও বিতর্কের মুখে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অভিযোগ উঠেছে, প্রায় দুই দশক আগে ভর্তি হওয়া কয়েকজনসহ ছাত্রদল ও যুবদলের অন্তত ৩৬ জন নেতাকর্মীকে ‘বিশেষ বিবেচনায়’ বিভিন্ন হলে সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।শিক্ষার্থীদের দাবি, সদ্য ভর্তি হওয়া ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা এখনো আবাসন সুবিধা না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। অথচ বহু আগের সেশনের শিক্ষার্থীদের হলে থাকার সুযোগ দেওয়ায় নতুন করে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে ক্যাম্পাসে। তাদের অভিযোগ, আবাসন সংকট নিরসনে নির্ধারিত নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করে রাজনৈতিক বিবেচনায় সিট বণ্টন করা হয়েছে।অভিযোগ রয়েছে, ‘বিশেষ বিবেচনায়’ সিট পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন। এমনকি অনেকের শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তারা এখনও হলে অবস্থান করছেন। এ পরিস্থিতিতে নবীন শিক্ষার্থীরা ঢাকায় এসে কোথায় থাকবেন তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন অনেকেই।এ ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন ডাকসু ও হল সংসদের নেতাকর্মীরা।সাত দিনের আলটিমেটামআবাসন সংকট নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সাত দিনের আলটিমেটাম দিয়েছে ডাকসু। বিক্ষোভ শেষে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বিষয়টি তুলে ধরেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এসএম ফরহাদ।তিনি বলেন, “তিন সপ্তাহ আগে উপাচার্যের কাছ থেকে দ্রুত সিট সমস্যার সমাধানের আশ্বাস পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কোনো কমিটি গঠন হয়নি, কার্যকর পরিকল্পনাও নেই।”তিনি আরও বলেন, আগামী শনিবারের মধ্যে যেসব শিক্ষার্থীকে সিট দেওয়া সম্ভব হবে না, তাদের জন্য আবাসন ভাতা বা উপবৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জনের কর্মসূচিতে যেতে পারেন।ফরহাদের অভিযোগ, একটি রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আবারও হলে ‘গণরুম’ ও ‘আদু ভাই’ সংস্কৃতি চালুর চেষ্টা করছে। শিক্ষার্থীরা এমন উদ্যোগ প্রতিহত করবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।চার দফা দাবিবিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—২০২৫-২৬, ২০২৪-২৫ ও ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত সিট বরাদ্দের সার্কুলার প্রকাশরেজিস্ট্রার ভবনের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও ডিজিটাল মনিটরিং চালুআগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সিট বরাদ্দ তালিকা প্রকাশদীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিতভাবে হলে থাকা ‘প্রবীণ’ শিক্ষার্থীদের সিট বাতিলপ্রশাসনের ব্যাখ্যাপ্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “যে ৩৬ জনকে সিট দেওয়া হয়েছে, তাদের অতি বিশেষ বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে তারা বঞ্চিত ছিল।”তিনি দাবি করেন, বিদ্যমান নীতিমালা অনুসরণ করেই সিট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে এবং নিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য সিট নিশ্চিত করতে প্রশাসন কাজ করছে।তবে প্রশাসনের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না এবং রাজনৈতিক প্রভাবেই সিট বণ্টন করা হচ্ছে।সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক নবীন শিক্ষার্থী বলেন, “ঢাকায় এসে আমরা কোথায় থাকব তা নিয়ে দিশেহারা। অথচ অনেক পুরোনো সেশনের শিক্ষার্থীরা সিট পাচ্ছেন—এটা মেনে নেওয়া কঠিন।”শিক্ষার্থীদের দাবি, বর্তমানে এক হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্নভাবে হলে অবস্থান করছেন। অনেকেই ইয়ার ড্রপ বা পুনঃভর্তির সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন হলে থাকার সুযোগ নিচ্ছেন, যা নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে।উপাচার্যের বক্তব্যএ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতভাগ আবাসিক নয়। তাই একসঙ্গে সবার জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। যদি আবাসন নিশ্চিত করে তারপর ক্লাস শুরু করতে হয়, তাহলে একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে।”তিনি জানান, আবাসন সংকটের বিষয়টি প্রভোস্টদের বৈঠকে আলোচনা করা হবে এবং আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে সিট সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশের চেষ্টা করা হবে।





মন্তব্য করুন