শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ

ঢাকা | বিশেষ প্রতিনিধি
সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রার বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি চক্রের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ ও সম্পদের মালিক হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।
বদলি বাণিজ্য ও চক্রের নেতৃত্বের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হচ্ছে, সাব-রেজিস্ট্রার বদলি করে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে যখন “মাইকেল চক্র” নিয়ে দুদকে ব্যবস্থা নেওয়ার তৎপরতা চলছিল, তখন সেই চক্রের মূলহোতা হিসেবে খিলগাঁওয়ের সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর নাম উঠে আসে।
তাকে কেন্দ্র করে বদলি বাণিজ্য ও ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে একটি শক্তিশালী আর্থিক প্রভাব বলয় তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে উল্লেখিত সম্পদের বিবরণ
অনুসন্ধান ও অভিযোগপত্র অনুযায়ী, তার নামে ও বেনামে দেশে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
রাজধানীর আফতাব নগরে বিলাসবহুল ভবনে ২৯টি ফ্ল্যাট
গুলশান-১ এর ৭ নম্বর রোডের কোহিনুর টাওয়ারে বর্তমান বাসস্থান, যেখানে দুটি ফ্লোর নিয়ে ডুপ্লেক্স জীবনযাপন
অ্যাসিওরেন্স মেহমান এইচ#১৫, আর#৩৬ এ ২৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট
নিজ জেলার বাঞ্চারামপুরের খাসনগর (পূর্ব পাড়া) এলাকায় ১০০ বিঘা কৃষিজমি
লাহিড়ী, রসুল্লাবাদ ও নবীনগরে ৩০ বিঘা কৃষিজমি, মাছের ঘের ও খামার
নিজ গ্রাম খাল্লা, বাড্ডা, সলিমগঞ্জ ও মাঝিয়ারার জীবননগরে ২০ একর কৃষিজমি ও মাছের ঘের/খামার
গুলশান-৪০/২ নর্থ এভিনিউতে ৩টি ফ্ল্যাট নির্মাণাধীন
গ্রিন ভিউ অ্যাপার্টমেন্ট, গুলশান-১ এলাকায় ২৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট (মূল্য ১২ কোটি টাকার বেশি)
স্ত্রী জান্নাত নীলার নামে গুলশানের একটি পূর্ণ প্লট (প্লট নং ১৪৩, ব্লক এইচ)
নিকেতন এ/১৩৩ ব্লক এ রোড-৩ এ ১৮০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট
হাতিরঝিলের কাছে ৪৮/এ এলাকায় ১৫৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট (শ্যালকের নামে)
গুলশান-১ এর ৩৩ নম্বর রোডের ৬ নম্বর হাউজে প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের ২টি ফ্ল্যাট (২০০০ বর্গফুট করে)
ধানমণ্ডি, গুলশান, নিকুঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট
এছাড়া আফতাব নগরে তার একটি শক্তিশালী বলয় থাকার কারণে আরও অনেক সম্পত্তির সঠিক হিসাব ও হোল্ডিং নম্বর নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, আফতাব নগরেই তার প্রায় ২৯টি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার প্রতিটির বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা।
নিয়োগ, প্রভাব ও রাজনৈতিক সংযোগের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নন-ক্যাডার থেকে সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পাওয়া ২৮তম বিসিএস ব্যাচের সদস্যদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন।
২০০৮ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে তিনি নিয়োগ পান বলে দাবি করা হয়। একই সঙ্গে চাকরির শর্ত পূরণ না করেও ৯৫ জনকে ক্যাডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও উল্লেখ রয়েছে।
তার আপন বোন আসমাউল হুসনা লিজা প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেন বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে।
এছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও সাবেক মন্ত্রী পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে নিয়োগ ও পোস্টিং নিশ্চিত করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
বদলি বাণিজ্য ও প্রশাসনিক প্রভাব
অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে তিনি বদলি বাণিজ্যের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। এই প্রভাব ব্যবহার করে তিনি দেশের বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে বদলি ও পোস্টিং নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এর ফলে তিনি সাব-রেজিস্ট্রার জগতের “গডফাদার” হিসেবে পরিচিতি পান বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
গণমাধ্যম ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নিজের অবস্থান শক্ত করতে তিনি কিছু উচ্চপর্যায়ের সাংবাদিকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং বিভিন্ন অভিযোগ উঠলে গণমাধ্যম ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করতেন। এতে করে প্রশাসনিক ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানোর অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে।
দুদকে অভিযোগ ও সারাদেশে তোলপাড়
গত ১৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাফসান আল আলভী দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। সেখানে “রমজান-মাইকেল চক্রের” বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য, ঘুষ লেনদেন ও শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়।
এর পর থেকেই বিষয়টি সারাদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
অভিযুক্তের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অবৈধ সম্পদ ও দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি বলে জানা গেছে।
শেষ কথা
অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন ও অনুসন্ধানমূলক পর্যায়ে রয়েছে। তবে দুদক তদন্ত হলে পুরো চক্র ও সম্পদের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

Facebook Comments Box