শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

দুর্নীতি করে শত কোটি টাকার মালিক চট্টগ্রাম এলএ শাখার আলী আজম, স্ত্রীর নামে ৭ তলা ভবন ও প্রিমিও গাড়ির অভিযোগ

চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি :

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার সাবেক উচ্চমান সহকারী ও বর্তমানে সাধারণ শাখার উপ-সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা এইচ. এম. আলী আজম খানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জন, ভূমি দখল, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কমিশন বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরিজীবী হয়েও তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ জমি, বাড়ি, ব্যাংক আমানত ও অন্যান্য সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাদের ভাষ্য, এসব সম্পদের পরিমাণ ও জীবনযাত্রা অনেকের কাছেই আলোচিত ড্রাইভার আবেদ আলী ও এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর রহমানের সম্পদ বিতর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়।আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের শোলকাটা গ্রামের মৃত মোজাম্মেল হক চৌধুরীর ছেলে এইচ. এম. আলী আজম খান বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, নিজের নামে ও বেনামে গড়ে তোলা বিপুল সম্পদের একটি বড় অংশ তিনি পরিবারের সদস্যদের নামে আড়াল করেছেন।স্থানীয় একাধিক ভুক্তভোগী ও অভিযোগকারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্পদের প্রভাব খাটিয়ে তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার, জমি সংক্রান্ত বিরোধে চাপ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানির অভিযোগের মুখে রয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পান।১২ গণ্ডা জমি দখলের অভিযোগভুক্তভোগীদের একজন আনোয়ারার শোলকাটা গ্রামের বাসিন্দা মো. সমির উদ্দিন অভিযোগ করেন, তাঁর বৈধভাবে ক্রয়কৃত ও দখলীয় প্রায় ১২ গণ্ডা জমি জোরপূর্বক দখল করে সেখানে দেয়াল ও পিলার নির্মাণ করেছেন এইচ. এম. আলী আজম খান। জমি দখলের প্রতিবাদ করায় তাঁকে একাধিকবার প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।এ ঘটনায় তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে পৃথক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।স্ত্রীর নামে ‘ড্যাফোডিল’ নামে ৭ তলা ভবনের অভিযোগ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়, চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ থানার পূর্ব নাছিরাবাদ পলিটেকনিক মোজাফফর নগর আবাসিক এলাকার হাজী মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী সড়কে ‘ড্যাফোডিল’ নামে একটি সাততলা ভবন রয়েছে।অভিযোগকারীর দাবি, ভবনটি আলী আজমের স্ত্রী মোহছেনা আক্তারের নামে নির্মিত। স্থানীয়দের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, জমিসহ ভবনটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকারও বেশি।এছাড়া ভবনটির বিদ্যুৎ মিটার নম্বর ০১০৪১০০৯৫৯২০ এবং ০১০৪১০০৯৪৮৪৮, যা স্ত্রী মোহছেনা আক্তারের নামে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।প্রিমিও গাড়ি ও সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্নঅভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, আলী আজম চট্ট-মেট্রো-গ-১২-০৯০৮ নম্বরের একটি প্রিমিও গাড়ি ব্যবহার করেন। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে কমিশন ও ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত অর্থে এসব সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা ভাইসহ পরিবারের সদস্যদের নামে চট্টগ্রাম মহানগর ও আনোয়ারা এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি ও সম্পদ ক্রয়ের অভিযোগও করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ জমা রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।৫ কোটি টাকার জমি ক্রয়ের তথ্যঅভিযোগকারীর দাবি, আনোয়ারা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল নং-১৬৫৩, তারিখ ১২ এপ্রিল ২০১৮ অনুযায়ী প্রায় ৫ কোটি ২৩ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের ১০ একর জমি ক্রয় করা হয়।অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই দলিলে আলী আজম নিজেকে ‘ব্যবসায়ী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও তিনি সরকারি চাকরিজীবী।‘কমিশনের চেক উড়ে এলএ শাখায়’২০২০ সালের ১ অক্টোবর চট্টগ্রামের একটি আঞ্চলিক দৈনিকে ‘কমিশনের চেক উড়ে এলএ শাখায়’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে ভূমি অধিগ্রহণে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল।অভিযোগকারীদের দাবি, সেই অনিয়মের সঙ্গে আলী আজম জড়িত ছিলেন এবং সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের সময় বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।দুদকের অনুসন্ধানের দাবিভুক্তভোগীদের দাবি, একাধিক লিখিত অভিযোগের পরও দীর্ঘদিন কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে সম্প্রতি দুদকের একটি টিম আনোয়ারায় তাঁর গ্রামের বাড়ি পরিদর্শন করেছে এবং সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।যা বললেন আলী আজমঅভিযোগের বিষয়ে এইচ. এম. আলী আজম খান বলেন, তাঁর নামে কোনো জমি, ভবন বা গাড়ি নেই। যে ভবনের কথা বলা হচ্ছে সেটি তাঁর নয়। তিনি আত্মীয়ের গাড়িতে চলাচল করেন বলে দাবি করেন।তিনি আরও বলেন, জমি নিয়ে দীর্ঘদিন বিরোধ থাকায় প্রতিপক্ষ এসব অভিযোগ করছে এবং এ বিষয়ে মামলা-মোকদ্দমাও রয়েছে।প্রশাসনের বক্তব্যচট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কামরুজ্জামানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, তিনি এ বিষয়ে অবগত নন এবং অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তদন্তসাপেক্ষপ্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্যগুলো অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো কোনো আদালত বা তদন্ত সংস্থা চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করেনি। বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

Facebook Comments Box