বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | ১৫ জুন, ২০২৬আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশের যেসব প্রভাবশালী কর্মকর্তা গ্রেফতার আতঙ্কে কাঁপছিলেন, তাদের অন্যতম ট্যুরিস্ট পুলিশ বাংলাদেশের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (অ্যাডিশনাল আইজি) মীর রেজাউল আলম। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই এই কর্মকর্তা ভোল পাল্টে আত্মগোপনে চলে যান। সরকারের পতনের পর গত ২ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এরপর গত ১৪ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে পল্টন থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলা হওয়ার ঠিক চার দিনের মাথায়, অর্থাৎ ১৮ সেপ্টেম্বর পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজশে গোয়েন্দা চোখ ফাঁকি দিয়ে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে চম্পট দেন।সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা ও বিশ্বস্ত সূত্রের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা গেছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যে হাজারো ভিআইপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু করেছে, সেই তালিকায় অন্যতম শীর্ষ নাম এই মীর রেজাউল আলম। তিনি দেশ ছেড়ে পালালেও পেছনে রেখে গেছেন তার অবৈধ উপার্জনের পাহাড়। বিভিন্ন অনুসন্ধানী সরকারি নথি ও সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, police সার্ভিসের ১৫তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা দেশের বিভিন্ন স্থানে নিজের ও স্ত্রীর নামে গড়ে তুলেছেন শত শত বিঘা জমি ও বিলাসবহুল প্রাসাদ।স্ত্রীর নামে ‘কালো টাকা’ সাদা করার মিশন!তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চোখ ফাঁকি দিতে মীর রেজাউল আলম কৌশলে নিজের চেয়ে তার স্ত্রী নাফিস সিদ্দিকি (পিতা- এ এম এ এইচ সিদ্দিকি, মাতা- হাসিনা বেগম)-র নামে সম্পত্তি কেনাকে বেশি নিরাপদ মনে করেছিলেন। একজন সরকারি চাকুরিজীবী হয়ে কীভাবে তার স্ত্রী এবং শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নামে এত বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি কেনা হলো, তার কোনো বৈধ জবাব দিতে পারেনি এই পরিবার।যেখানে যেখানে রয়েছে রেজাউল-নাফিস দম্পতির সম্পদের সাম্রাজ্য:সরকারি বেতনভুক্ত কর্মকর্তা হয়েও এই দম্পতি ঢাকা ও নরসিংদীতে যেভাবে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তার একটি এক্সক্লুসিভ খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো:উত্তরায় আলিশান প্রাসাদ: রাজধানী ঢাকার ভিআইপি এলাকা উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের ৬ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর প্লটে রয়েছে তার চোখ ধাঁধানো বহুতল ভবন।বাউনিয়াতে বিশাল জমি: জোত নং- ১৫০/৮৮ এর অধীনে রাজধানীর বাউনিয়া এলাকায় রয়েছে ৮.২৫ শতক অত্যন্ত মূল্যবান জমি।নরসিংদীতে অঢেল জমিদারী (মৌজা ও জোত ভিত্তিক খতিয়ান):১. মৌজা ভাটপাড়া: জোত খতিয়ান- ৩৩৬৭ এর অধীনে স্ত্রীর নামে বিশাল পরিমাণ জমি।২. মৌজা নগর পাঁচদোনা: জোত নং- ৪৮৪, জমির পরিমাণ ৮ শতক।৩. মৌজা নেহাব: জোত নং- ১৯৪০, জমির পরিমাণ ১৬.৬৬ শতক।৪. মৌজা কামারচর: জোত নং- ২০৮, জমির পরিমাণ ১৫ শতক।৫. মৌজা ভাটপাড়া (২য় প্লট): জোত নং- ৩৫৭৫, জমির পরিমাণ ১৩৮.৮ শতক (বিশাল এলাকা)।৬. মৌজা ভাটপাড়া (৩য় প্লট): জোত নং- ১৯১০, জমির পরিমাণ ৭৭.২১ শতক।৭. মৌজা ভাটপাড়া (৪র্থ প্লট): জোত নং- ৪৫৬৩, জমির পরিমাণ ৮.৪৩ শতক।৮. মৌজা ভাটপাড়া (৫ম প্লট): জোত নং- ৪৬৩২, জমির পরিমাণ ৩.০৩ শতক।৯. মৌজা ভাটপাড়া (৬ষ্ঠ প্লট): জোত নং- ১৯৫৬, জমির পরিমাণ ৭.৫ শতক।এছাড়াও মাহবুব আলম, জাকির হোসেন (১৯৪০), রেজাউল হোসেন (৩৫৭৫) এবং মেহেরুন নেছা নামের বেশ কয়েকজন ‘বেনামদার’ ও সহযোগীর সাথে যৌথ নামে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি কেনা এবং সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ এখন গোয়েন্দাদের হাতে।সম্পত্তি ক্রোকের প্রস্তুতি, ইন্টারপোলের মাধ্যমে ফেরানোর দাবিমীর রেজাউল আলমের মাগুরার শ্রীপুর এলাকার চৌগাছির গ্রামের বাড়ি এবং উত্তরার বাসভবনে এখন সুনসান নীরবতা। দেশবাসীর প্রশ্ন—বিগত সরকারের আমলে পুলিশের শীর্ষ পদে থেকে যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা লুট করেছেন এবং এখন বিশেষ ফন্দিতে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন, তাদের পাচার করা টাকা কীভাবে ফেরত আনা হবে?





মন্তব্য করুন