নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংকিং আইন ও নীতিমালা উপেক্ষা করে পরিবারের সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, পুত্রবধূ ও দুই ভাতিজাকে বয়স, অভিজ্ঞতা এবং প্রচলিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করেই ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পদোন্নতি, বদলি ও নিয়োগেও তাদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা।
ব্যাংকসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে অবসরের পর স্বাধীন পরিচালক হিসেবে কমার্স ব্যাংকে যোগ দিয়ে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন মো. আতাউর রহমান। এরপরই নিজের পুত্রবধূ তানজিনা সুলতানা (রিমা)কে অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার, ভাতিজা সাইফুল ইসলামকে সিনিয়র অফিসার এবং আরেক ভাতিজা মো. আরিফুল ইসলামকে কমার্স সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব নিয়োগে কোনো উন্মুক্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি এবং প্রচলিত নিয়োগ প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হয়নি।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর তানজিনা সুলতানাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয় ৪০ হাজার ৯৫০ টাকা। পরে তাকে রাজধানীর দিলকুশা শাখায় পদায়ন করা হয়। ব্যাংকে জমা দেওয়া জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী বর্তমানে তার বয়স ৩৮ বছর।
ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দিলকুশা শাখায় কর্মরত থাকলেও তানজিনা সুলতানা পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন ও প্রশাসনিক নানা সিদ্ধান্তে অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রভাব বিস্তার করছেন। তাদের দাবি, চেয়ারম্যান এসব বিষয়ে তার মতামতকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ সূত্রের ভাষ্য, গত দেড় মাসে প্রায় ৫০ জন কর্মকর্তার বদলি ও বিভিন্ন পদে পদায়নের ক্ষেত্রে তানজিনা সুলতানার প্রভাব ছিল। এসব সিদ্ধান্তকে ঘিরে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
ব্যাংক থেকে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, "তানজিনা কার্যত ব্যাংকের স্বঘোষিত এমডি হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন। তার মতের বাইরে গেলেই পদোন্নতি আটকে দেওয়া, বদলি কিংবা সাময়িক বরখাস্তের মতো ঘটনা ঘটছে।"
ইতোমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন এসএভিপি জহিরুল ইসলাম মণ্ডল, এভিপি সৈয়দ ইশতিয়াক হোসেন, এফএভিপি জাহেদা সিদ্দিকা এবং এসপিও সুখরঞ্জন বারই। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, চেয়ারম্যানের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণেই তাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত সাবেক কর্মকর্তা সৈয়দ ফজলে রাব্বিকে পুনঃনিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১০ জনকে নিয়োগের প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
ব্যাংকের ভেতরে সম্প্রতি একযোগে ৩১৮ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার ঘটনাও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও নতুন নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওবায়দুল হক বলেন, চেয়ারম্যানের পুত্রবধূ ও ভাতিজাদের নিয়োগ তার দায়িত্ব গ্রহণের আগেই হয়েছে। তাই বিষয়টি সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি অবগত নন। নতুন নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মী নেওয়া হচ্ছে এবং বর্তমানে ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। তার দাবি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন।
অন্যদিকে ব্যাংকের সাবেক এমডি মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন এর আগে দাবি করেছিলেন, ব্যাংকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ ছিল না। চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের হস্তক্ষেপের কারণে তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেন।
ব্যাংকের এক পরিচালকও অভিযোগ করেন, চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিচালনা পর্ষদে তার একক প্রভাব তৈরি হয়েছে। ফলে অন্য পরিচালকদের মতামত কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।





মন্তব্য করুন