অনলাইন ডেস্ক: খেলাপি ঋণ কমানো এবং ব্যাংকিং খাতে আটকে থাকা অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এককালীন ‘এক্সিট সুবিধা’ চালু করলেও বাস্তবায়নে দেখা দিয়েছে নানা জটিলতা। নীতিমালা ঘোষণার প্রায় দুই সপ্তাহ পরও দেশের অনেক বেসরকারি ব্যাংক আবেদন গ্রহণ, সুদ মওকুফ এবং ঋণ নিষ্পত্তির বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বহু ব্যবসায়ী।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন, আর্থিক ঝুঁকি, সম্ভাব্য ক্ষতি এবং ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ বাড়ার আশঙ্কার কারণে অনেক ব্যাংক এখনো এক্সিট সুবিধা কার্যকর করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। অন্যদিকে উদ্যোক্তাদের দাবি, শুধু সুদ মওকুফ বা এককালীন ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং তারল্য সংকটের কারণে শত শত শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে সহজ শর্তে নতুন অর্থায়নের ব্যবস্থা না করলে অধিকাংশ ঋণগ্রহীতার পক্ষে এককালীন বকেয়া পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। ফলে খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্যও অর্জিত হবে না।
গত ২৯ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক জারি করা এক সার্কুলারে জানায়, ৩০ জুন ২০২৬ ভিত্তি তারিখে মন্দ ও ক্ষতিজনক হিসেবে শ্রেণিকৃত ঋণ এককালীন এক্সিট সুবিধার আওতায় আনা যাবে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে এবং ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্ক বিবেচনায় এ সুবিধা দেওয়া হবে। যোগ্য ঋণগ্রহীতাকে একবারেই সম্পূর্ণ বকেয়া অর্থ পরিশোধ করতে হবে এবং প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে মূল্যায়ন করবে ব্যাংক।
তবে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত পুনঃতফসিল করা ঋণ, স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ এবং কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের ঋণ এই সুবিধার বাইরে রাখা হয়েছে।
ব্যাংকারদের মতে, দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ আদায়ে এ উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এতে ব্যাংকগুলোর নগদ অর্থপ্রবাহ বাড়বে এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। তবে কোনো গ্রাহককে এ সুবিধা দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই এবং তদন্ত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অন্যদিকে বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরছেন ব্যাংকাররা। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে ঋণের সুদ মূলধনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যাংকের আয় হিসেবে হিসাবভুক্ত হয়েছে। সেই আয়ের ওপর কর পরিশোধ এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশও দেওয়া হয়েছে। ফলে ইতোমধ্যে আয় হিসেবে গণ্য হওয়া সুদের অংশ এখন মওকুফ করা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন।
ব্যবসায়ীদের দাবি, অধিকাংশ খেলাপি শিল্প উদ্যোক্তার হাতে এককালীন ঋণ পরিশোধের মতো অর্থ নেই। অর্থ থাকলে তারা আগে বন্ধ কারখানাগুলোই চালু করতেন। তাই উৎপাদন সচল করতে নতুন মূলধন জোগান দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
শিল্প পুলিশ ও উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থায়নের অভাবে ৫ শতাধিক শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। শুধু তৈরি পোশাক খাতেই প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে সরকার বন্ধ শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করতে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রাক-অর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে। ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবহার করে পরিচালিত এই তহবিল থেকে কার্যকর মূলধনের সংকটে থাকা শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানকে নতুন ঋণ দেওয়া হবে, যাতে তারা আবার উৎপাদনে ফিরতে পারে।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, শুধু এককালীন ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। সহজ শর্তে নতুন ঋণ দেওয়া হলে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে ফিরতে পারবে এবং একই সঙ্গে ব্যাংকের খেলাপি ঋণও ধীরে ধীরে আদায় সম্ভব হবে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী আবেদনগুলো যথাযথভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং নির্দেশনা অনুসারেই এককালীন ঋণ পরিশোধের বিষয়টি বাস্তবায়ন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, কোনো জটিলতা ছাড়াই গ্রাহকদের এক্সিট সুবিধা দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল থেকে নতুন ঋণের সুযোগ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি নীতিমালার বাস্তবায়নও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, খেলাপি ঋণ আদায়, ব্যাংকিং খাতে তারল্য বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণসংক্রান্ত মামলার জট কমাতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাস্তব প্রয়োগে থাকা নীতিগত ও কারিগরি জটিলতাগুলোর স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হলে উদ্যোগটি আরও কার্যকর হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু এককালীন এক্সিট সুবিধা চালু করলেই খেলাপি ঋণ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর জন্য দ্রুত নতুন অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যাংকের ঋণ আদায়—তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
তথ্য সূত্র: কালের কন্ঠ





মন্তব্য করুন