শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশি পাসপোর্টে বিদেশে যাচ্ছেন রোহিঙ্গারা, ঝুঁকিতে শ্রমবাজার ও জাতীয় নিরাপত্তা

বাংলাদেশি পাসপোর্টে বিদেশে যাচ্ছেন রোহিঙ্গারা, ঝুঁকিতে শ্রমবাজার ও জাতীয় নিরাপত্তা

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশি পরিচয় ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ভুয়া জন্ম নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং সংঘবদ্ধ দালালচক্রের সহায়তায় অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহের চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর ও নেত্রকোনায় এমন একাধিক ঘটনা ধরা পড়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই জালিয়াতি শুধু জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই হুমকি নয়, বরং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং বৈদেশিক শ্রমবাজারের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে নিবন্ধিত প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি পরিচয়ে আরও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বসবাস করছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা। সংঘবদ্ধ দালালচক্রের মাধ্যমে তারা ভুয়া কাগজপত্র সংগ্রহ করে বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয় গ্রহণের চেষ্টা করছে।

গত বছরের ১ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের সময় আজিজ খান নামে এক রোহিঙ্গা যুবকের পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়। তিনি নিজেকে ‘হাফেজ আব্দুল আজিজ’ পরিচয়ে বাংলাদেশি দাবি করে পাসপোর্টের আবেদন করেছিলেন। তদন্তে জানা যায়, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে প্রবেশের পর দালালচক্রের সহায়তায় ভুয়া জন্ম নিবন্ধন ও অভিভাবকের তথ্য ব্যবহার করে তিনি প্রায় পাসপোর্ট পাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তবে বায়োমেট্রিক তথ্য যাচাইয়ের সময় তার প্রতারণা ধরা পড়ে।

একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে চাঁদপুরেও। সেখানে বাংলাদেশি পরিচয়ে সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তুতিকালে দুই রোহিঙ্গা নারী আটক হন। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানান, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে দালালরা তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র তৈরি করে দিয়েছিল।

নেত্রকোনাতেও মো. করিম নামে এক রোহিঙ্গা পাসপোর্ট করতে গিয়ে ধরা পড়েন। তার কাছ থেকে সৌদি আরবের একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স উদ্ধার করা হয়। ভাষাগত অসঙ্গতি দেখে সন্দেহ হলে তদন্তে তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়। পরে তাকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাইয়ে দিতে সংঘবদ্ধ একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা পর্যায়ক্রমে রোহিঙ্গাদের সংগ্রহ, ভুয়া জন্ম নিবন্ধন ও এনআইডি তৈরি এবং পাসপোর্টের বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করে থাকে।

সম্প্রতি এই চক্রের ২৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্তে উঠে এসেছে, প্রতি পাসপোর্টের জন্য তারা ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা, আর জটিল ক্ষেত্রে এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে। অনেক রোহিঙ্গা বিদেশে যাওয়ার আশায় নিজেদের স্বর্ণালংকার বিক্রি করেও এই অর্থের ব্যবস্থা করেন।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মচারী যথাযথ যাচাই ছাড়া অর্থের বিনিময়ে জন্ম নিবন্ধন ও নাগরিকত্ব সনদ ইস্যু করছেন। ফলে ভুয়া পরিচয়ে এনআইডি সংগ্রহ করা সহজ হয়ে যাচ্ছে এবং পরবর্তীতে সেই নথির ভিত্তিতেই পাসপোর্টের আবেদন করা হচ্ছে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ই-পাসপোর্ট চালুর পর জালিয়াতি অনেক কমলেও মূল সমস্যা রয়ে গেছে প্রাথমিক নথিপত্রে। যদি জন্ম নিবন্ধন ও এনআইডি বৈধভাবে ইস্যু করা থাকে, তাহলে আবেদনকারীর প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ডেটাবেইসে তথ্য না থাকলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশে বাংলাদেশি পরিচয়ে কোনো রোহিঙ্গা অপরাধে জড়ালে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের ওপর। এতে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা নীতিতে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে, যা বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকার মানুষের সঙ্গে ভাষা ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মিল থাকায় অনেক রোহিঙ্গা স্থানীয়দের সঙ্গে সহজেই মিশে যেতে পারছে। দীর্ঘদিন ধরে বসবাসের সুযোগে কেউ কেউ স্থানীয়ভাবে জমি কিনছেন, আবার অনেকে স্থানীয় পরিবারে বিয়েও করছেন। ফলে তাদের শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পাসপোর্ট অফিসে নজরদারি বাড়ালেই হবে না। জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় কঠোর যাচাই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জন্ম নিবন্ধন, এনআইডি এবং রোহিঙ্গা ডেটাবেইসের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় তথ্য সমন্বয় (ডেটা ইন্টিগ্রেশন) চালু করা জরুরি। পাশাপাশি জাল নথি তৈরিতে জড়িত জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তা ও দালালদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পরিচয়ে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে দেশের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বৈদেশিক শ্রমবাজার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

তথ্য সূত্র: কালের কন্ঠ

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

Facebook Comments Box