অনলাইন ডেস্ক: রাজধানীতে একসময় ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতেন। পরে পুরোনো এসি কেনাবেচার ব্যবসায় জড়ান। সেখান থেকে নিজেকে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের ‘প্রটোকল অফিসার’ পরিচয় দিয়ে চাকরি, বদলি ও পদোন্নতির নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিনের আলোচিত সেই ব্যক্তি হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস, যিনি পরে নাম পরিবর্তন করে তাওহীদ ইসলাম হন, এবার সিআইডির হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
রোববার (১২ জুলাই) রাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ইলেকট্রিশিয়ান থেকে প্রভাবশালী পরিচয়ের গল্প
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর বাসিন্দা হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস জীবনের শুরুতে রাজধানীর উত্তরায় ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতেন। পাশাপাশি পুরোনো এসি কিনে মেরামত করে বিক্রির ব্যবসাও চালাতেন।
পরবর্তীতে তিনি নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের ‘প্রটোকল অফিসার’ হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। সেই পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রভাব বিস্তার করেন এবং চাকরি, বদলি, পদোন্নতিসহ নানা সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নিয়োগ-বাণিজ্যে কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে তিনি এই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে শতাধিক মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। এর আগে ২০২২ সালের নভেম্বরে একই ধরনের প্রতারণার অভিযোগে র্যাব তাকে এক সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করেছিল।
তদন্তে তখন তার নামে প্রায় চার কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের তথ্যও উঠে আসে।
প্রতারণার টাকায় রিসোর্ট নির্মাণ
র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে হরিদাস জানিয়েছিলেন, প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া এলাকায় প্রায় এক বিঘা জমি কিনে ‘প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক’ নামে একটি রিসোর্ট নির্মাণ করেন।
প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রিসোর্টটি ২০২১ সালে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, রিসোর্ট নির্মাণের সময়ও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে কোনো রসিদ ছাড়াই লাখ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল।
ধর্মান্তরিত হয়ে নাম বদল
তদন্তে আরও জানা যায়, হরিদাস ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় অবৈধভাবে পার্শ্ববর্তী একটি দেশে যান। পরে সেখানে পড়াশোনা ও ইলেকট্রনিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
২০১০ সালে বাংলাদেশে ফিরে উত্তরায় ব্যবসা শুরু করেন। ২০১৯ সালে ধর্মান্তরিত হয়ে এক সবজি ব্যবসায়ীর মেয়েকে বিয়ে করেন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে তাওহীদ ইসলাম রাখেন।
রামমূর্তি নির্মাণ নিয়ে আলোচনায়
পরবর্তীতে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ৮১ ফুট উচ্চতার রামমূর্তি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। একই সময়ে স্থানীয়ভাবে নিজেকে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে দামি গাড়িতে চলাফেরা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং উন্নয়ন প্রকল্প এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সিআইডির তদন্তে নতুন তথ্যের অপেক্ষা
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে থাকা প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির অভিযোগগুলো নতুন করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে তার সম্পদের উৎস, প্রতারণার নেটওয়ার্ক এবং সহযোগীদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।





মন্তব্য করুন