আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অস্ত্রভান্ডার দ্রুত কমে আসছে। সামরিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনায় ওয়াশিংটনকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বাড়বে কৌশলগত ঝুঁকি
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত আরও দীর্ঘ হলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মজুতের ওপর চাপ বাড়বে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা কৌশলেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)–এর প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক কানসিয়ান বলেন, বর্তমান গতিতে যুদ্ধ চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার এমন পর্যায়ে নেমে আসতে পারে, যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংঘাতে বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ধাপেই যুক্তরাষ্ট্র কয়েক হাজার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
সিএসআইএসের তথ্য বলছে, গত এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাদের—
- থাড (THAAD) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের প্রায় অর্ধেক,
- প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় অর্ধেক,
- এবং টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যবহার করেছে।
এ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক মাইকেল ও’হ্যানলন। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত প্রত্যাশার তুলনায় অনেক দ্রুত কমে যাচ্ছে।
মজুত পূরণে লাগতে পারে কয়েক বছর
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবহৃত অস্ত্রের ঘাটতি পূরণ সহজ হবে না। বর্তমানে পেন্টাগন প্রতি মাসে গড়ে মাত্র ১৫টি টমাহক এবং ২০টি নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছে। এছাড়া ২০২৬ সালের মধ্যে নতুন থাড ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের সম্ভাবনাও নেই।
সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা এলেন ম্যাককাসকার বলেন, বর্তমান ঘাটতি পূরণ করে আগের অবস্থায় ফিরতে দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোগ, তবু তাৎক্ষণিক সমাধান নয়
প্রতিরক্ষা শিল্প বিশ্লেষক জন ফেরারি জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরু হলেও নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের জন্য কংগ্রেস এখনো অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেয়নি। ফলে উৎপাদন স্বাভাবিক গতিতেই চলছে।
এ অবস্থায় হোয়াইট হাউস যুদ্ধ ব্যয়ের জন্য অতিরিক্ত বাজেট চেয়েছে। পাশাপাশি ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন উৎপাদন লাইন চালু করা সময়সাপেক্ষ। উদাহরণ হিসেবে জাপানে একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা নির্মাণে প্রায় তিন বছর সময় লেগেছে। অন্যদিকে জার্মানি ২০২২ সালে প্রকল্প শুরু করলেও এখনো উৎপাদন শুরু করতে পারেনি।
পেন্টাগনের দাবি, সক্ষমতা এখনো অটুট
যদিও এসব আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল বলেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এখনো যুক্তরাষ্ট্রেরই। প্রয়োজন হলে যেকোনো সামরিক অভিযান পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা ও অস্ত্র তাদের হাতে রয়েছে।
তবে গবেষক মাইকেল ও’হ্যানলন মনে করেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অস্ত্রের মজুত কমতে থাকলে সেই সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।





মন্তব্য করুন