অনলাইন ডেস্ক: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় এক যুবককে গুলি করে গুরুতর আহত এবং দুইজনকে হত্যার ঘটনায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দেওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। ১৪৭ পৃষ্ঠার এ রায় প্রকাশের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্ত ও গ্রেফতার আসামিদের জন্য আপিলের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মোর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ বিচারকদের স্বাক্ষরের পর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে। আইন অনুযায়ী, রায় প্রকাশের এক মাসের মধ্যে সাজাপ্রাপ্তরা আপিল করতে পারবেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিনজন
রায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে—
- ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান
- খিলগাঁও জোনের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম
- রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমানকে
এছাড়া মামলায় রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাঁচ আসামির মধ্যে বর্তমানে শুধু চঞ্চল চন্দ্র সরকার গ্রেফতার রয়েছেন।
রায়ে উঠে এসেছে অস্ত্র ব্যবহারের বিস্তারিত তথ্য
পূর্ণাঙ্গ রায়ে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রামপুরা এলাকায় সংঘটিত ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
রায়ে উল্লেখ করা হয়, ওইদিন রামপুরা থানা ও পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা চায়না রাইফেল, শর্টগান ও পিস্তল ব্যবহার করেন। তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চায়না রাইফেল থেকে ৫৫৩ রাউন্ড, পিস্তল থেকে ২৮ রাউন্ড, শর্টগান থেকে ৩২৩ রাউন্ড রাবার বুলেট এবং ৭৭১ রাউন্ড সিসার (লেড) বুলেট নিক্ষেপ করা হয়। ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অভিযানে প্রাণঘাতী ও কম প্রাণঘাতী—উভয় ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।
যেভাবে গুলিবিদ্ধ হন আমির হোসেন
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যান আমির হোসেন। প্রাণ বাঁচাতে তিনি একটি নির্মাণাধীন ভবনের চারতলায় আশ্রয় নেন।
পরে পুলিশ সদস্যরা ভবনে উঠে তাকে নিচে লাফ দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন। ভয় পেয়ে ভবনের কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকলে নিচ থেকে তাকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি ছোড়া হয়। এতে তার দুই পায়ে গুলি লাগে। পরে পুলিশ চলে গেলে তিনি নিচে নেমে আসেন এবং স্থানীয়রা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। গুরুতর আহত হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
একই দিনে নিহত হন নাদিম ও মায়া ইসলাম
সেদিন রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন নাদিম হোসেন ও মায়া ইসলাম। এছাড়া সাত বছর বয়সী বাসিত খান মুসা গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও মামলার অন্যতম অভিযোগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তিনটি অভিযোগে বিচার সম্পন্ন
মামলায় তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এগুলো হলো—
- নাদিম হোসেনকে গুলি করে হত্যা,
- আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে গুরুতর আহত করা,
- গুলিতে শিশু বাসিত খান মুসাকে আহত করা এবং একই ঘটনায় তার দাদি মায়া ইসলামকে হত্যা।
উল্লেখ্য, গত ২৮ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলার রায় ঘোষণা করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধসংক্রান্ত মামলাগুলোর মধ্যে এটি ছিল ট্রাইব্যুনালের পঞ্চম রায়।





মন্তব্য করুন