শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

মাছ ধরার লাইসেন্স ছাড়াই গভীর সাগরে ট্রলার, ঝুঁকিতে জেলেদের জীবন; নিখোঁজ ৫

মাছ ধরার লাইসেন্স ছাড়াই গভীর সাগরে ট্রলার, ঝুঁকিতে জেলেদের জীবন; নিখোঁজ ৫

বৈধ লাইসেন্স নেই, নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম। তবুও বছরের পর বছর গভীর সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছে শত শত ট্রলার। আর এই অনিয়ন্ত্রিত বাস্তবতার ভয়াবহ মূল্য দিচ্ছেন উপকূলের জেলেরা। সাম্প্রতিক ট্রলারডুবিতে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার পাঁচ জেলে এখনও নিখোঁজ। স্বজনদের অপেক্ষা আর কান্নার মধ্যেই সামনে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য—উপজেলার কোনো ট্রলারেরই গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার বৈধ লাইসেন্স নেই।

জানা গেছে, গত ৫ জুলাই বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে একটি ট্রলার ডুবে যায়। ট্রলারটিতে থাকা ১১ জেলের মধ্যে ছয়জনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন হারুন হাওলাদার, এমাদুল, ফোরকান, আবু সায়েম ও আক্কাস।

শেষ ফোনে ছিল ফিরে আসার আশ্বাস

নিখোঁজ জেলে আবু সায়েম সাগরে যাওয়ার আগে মাকে ফোন করে বলেছিলেন, “মা, দোয়া কইরো। মাছ পাইলে দুই-তিন দিনের মধ্যে আমি আর আব্বা ফিরমু।” কিন্তু সেই ফেরা আর হয়নি। প্রতিদিন নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে ছেলের অপেক্ষায় থাকেন তার মা। ট্রলার ভিড়লেই মনে হয় ছেলে ফিরেছে, কিন্তু প্রতিবারই ভেঙে যায় সেই আশা।

অন্যদিকে, প্রথমবার গভীর সমুদ্রে যাওয়া জেলে আক্কাস সংসারের ঋণ শোধের স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন। তার স্ত্রী প্রাপ্তি জানান, স্বামী বলেছিলেন এই ট্রিপ থেকেই সংসারের ভাগ্য বদলাবে। এখন ছোট্ট সন্তান বাবার জন্য অপেক্ষা করে, আর তিনি আল্লাহর কাছে অন্তত স্বামীর মরদেহ ফিরে পাওয়ার প্রার্থনা করছেন।

উদ্ধারে বিলম্বের অভিযোগ

ট্রলারডুবি থেকে জীবিত ফিরে আসা জেলে আল আমিন জানান, তিন দিন উল্টে থাকা ট্রলারের ওপর এবং আরও একদিন ভাসমান অবস্থায় কাটিয়েছেন তিনি। তার অভিযোগ, সময়মতো উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হলে নিখোঁজ পাঁচ জেলেকেও জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারত।

গভীর সমুদ্রে ট্রলার, কিন্তু নেই বৈধ লাইসেন্স

গলাচিপা উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার কোনো ট্রলারেরই গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার লাইসেন্স নেই। বর্তমানে ১৯০টি অনুমতিপত্র থাকলেও সেগুলো কেবল উপকূলীয় এলাকায় মাছ ধরার জন্য প্রযোজ্য।

সামুদ্রিক মৎস্য আইন-২০২০ অনুযায়ী গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে নিবন্ধন, লাইসেন্স, জিপিএস, রেডিও, লাইফ জ্যাকেট ও লাইফ বয়ার মতো নিরাপত্তা সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ ট্রলারেই এসবের কোনো ব্যবস্থা নেই।

বছরের পর বছর ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা

দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে মাছ ধরা জেলে বেল্লাল মাঝি বলেন, ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট, লাইফ বয়া কিংবা জিপিএস নেই। শুধু উপজেলা মৎস্য অফিসের অনুমতিপত্র নিয়েই তারা গভীর সাগরে যান। এটিকেই এতদিন লাইসেন্স হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে।

ট্রলার মালিক আল মামুন মৃধা বলেন, নিয়মিত তদারকি হলে অল্প সময়ের মধ্যেই সব ট্রলারে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা সম্ভব।

প্রাণহানির সঠিক হিসাবও নেই

মৎস্য বিভাগের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে গলাচিপা থেকে গভীর সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে অন্তত ১৪ জন জেলে নিহত হয়েছেন। চলতি বছর নিখোঁজ হয়েছেন আরও পাঁচজন। তবে কত ট্রলার ডুবেছে, কতজন আহত হয়েছেন কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন—সে বিষয়ে সরকারের কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই।

উপজেলা আদালত সূত্র জানিয়েছে, ট্রলারডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলাও হয়নি।

প্রশাসনের বক্তব্য

গলাচিপা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুর নবী বলেন, উপজেলার কোনো ট্রলারেরই গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার লাইসেন্স নেই। এছাড়া বাংলাদেশে ট্রলারডুবিতে নিহত বা নিখোঁজের ঘটনায় মামলা করার সংস্কৃতিও এখনো গড়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশ কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের রাঙ্গাবালী কন্টিনজেন্ট কমান্ডার মো. ইমরান কবির বলেন, কোনো দুর্ঘটনার খবর পেলেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সন্দেহ হলে ট্রলার তল্লাশিও করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের গবেষক সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, শুধু আবহাওয়ার সতর্কবার্তা প্রচার করলেই প্রাণহানি কমবে না। বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা সরঞ্জাম, জেলেদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিয়মিত পরিদর্শন, দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা এবং আইনের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, এসব ব্যবস্থা কার্যকর না হলে জীবিকার সন্ধানে গভীর সাগরে যাওয়া হাজারো জেলের জন্য সমুদ্র বারবার মৃত্যুফাঁদ হয়ে ফিরে আসবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

Facebook Comments Box