শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

১০ মাসের প্রকল্প শেষ হয়নি ১৮ মাসেও, তুলে নেওয়া হলো পুরো বিল

১০ মাসের প্রকল্প শেষ হয়নি ১৮ মাসেও, তুলে নেওয়া হলো পুরো বিল

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া পিইডিপি-৪ (PEDP-4) প্রকল্পে অনিয়ম ও ধীরগতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। চুক্তি অনুযায়ী ১০ মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ১৮ মাস পেরিয়ে গেলেও সাতটি ওয়াশব্লকের নির্মাণকাজ এখনো অসম্পূর্ণ। এর মধ্যেই পুরো প্রকল্পের বিল উত্তোলনের অভিযোগে প্রশ্ন উঠেছে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে।

অভিযোগ রয়েছে, কার্যাদেশপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে অন্য একজনের মাধ্যমে নির্মাণকাজ পরিচালনা করা হয়েছে। এছাড়া নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং কাজ অসমাপ্ত রেখেই পুরো বিল তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে সাতটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী ও শিক্ষক চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কমলগঞ্জ উপজেলার দরগাপুর, রসুলপুর, তিলকপুর, জামিরকোনা, ড. চেরাগ উদ্দিন, ফুলবাড়ী ও কোনাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একতলা আরসিসি (RCC) ওয়াশব্লক নির্মাণের জন্য ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর কুড়িগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নুর ট্রেডার্সকে ১ কোটি ৩০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৯৯ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময় ছিল ১০ মাস।

তবে অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মাত্র কয়েকটি বিদ্যালয়ে সীমিত পরিসরে কাজ শুরু হলেও তা অল্প সময়ের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০২৬ সালের জুনে বরাদ্দ ফেরত যাওয়ার আশঙ্কায় কুলাউড়ার সিরাজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে দিয়ে পুনরায় কাজ শুরু করা হয়।

শনিবার (২৫ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, ফুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওয়াশব্লকের প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ এখনও অসম্পূর্ণ। প্লাস্টার, টাইলস, পানির সংযোগ, বেসিন ও সিঁড়ির কাজ শেষ হয়নি। তিলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েরও প্রায় ২০ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে।

এদিকে পুরোনো শৌচাগার ভেঙে ফেললেও নতুন ওয়াশব্লক চালু না হওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিশেষ করে নারী শিক্ষক ও ছাত্রীদের আশপাশের বাড়ির শৌচাগার ব্যবহার করতে হচ্ছে। একই চিত্র দেখা গেছে দরগাপুর, রসুলপুর, ড. চেরাগ উদ্দিন, জামিরকোনা ও কোনাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর)-২০০৮ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। বরং নিম্নমানের ইট, খোয়া, টাইলস ও ফিটিংস ব্যবহার করে অসম্পূর্ণ কাজের বিপরীতে জুন মাসেই পুরো বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক কর্মচারী জানান, কার্যাদেশপ্রাপ্ত নুর ট্রেডার্সের কোনো প্রতিনিধিকে কখনো কাজের স্থানে দেখা যায়নি। পুরো কাজ পরিচালনা করছেন কুলাউড়ার সিরাজুল ইসলাম।

একাধিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করেন, নির্মাণকাজে তদারকির অভাব রয়েছে। অনেক স্থানে নতুন বসানো টাইলস ও ফিটিংস ইতোমধ্যেই খুলে পড়তে শুরু করেছে।

তিলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা বলেন, “সমস্যার বিষয়টি বারবার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”

ফুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহাবুদ্দিন, রসুলপুরের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফাহিমা বেগম এবং জামিরকোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইসমত আরা জোন্স দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে ওয়াশব্লকগুলো চালুর দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে কাজের দায়িত্বে থাকা সিরাজুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি অফিসের অনুমোদন নিয়েই কাজ করছেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে বিস্তারিত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানেন।

এ বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বাবর বলেন, বিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী তালিকা পাঠানো ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে তাদের কোনো দায়িত্ব নেই।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সুজন আহমেদ বলেন, “কাজটি কার্যাদেশপ্রাপ্ত নুর ট্রেডার্সই বাস্তবায়ন করছে। অন্য কাউকে দিয়ে কাজ করানোর সুযোগ নেই। নির্মাণকাজে কোনো অনিয়ম হয়নি এবং মানসম্মত সামগ্রীই ব্যবহার করা হয়েছে।”

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

Facebook Comments Box