শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

ছয় মাসে সীমান্ত থেকে ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ

ছয় মাসে সীমান্ত থেকে ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ

সীমান্তজুড়ে চোরাচালান দমনে অভিযান জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় ১ হাজার ৯৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা মূল্যের চোরাচালান পণ্য জব্দ করেছে বাহিনীটি। বিজিবির বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন ও সদর দপ্তরের সমন্বিত অভিযানে এসব পণ্য উদ্ধার করা হয়েছে।

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া পণ্যের মধ্যে রয়েছে সোনা, রুপা, মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, প্রসাধনী, ভারতীয় শাড়ি, তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিকস সামগ্রীসহ অন্তত ৪০ ধরনের অবৈধ পণ্য। এর আগে ২০২৫ সালে প্রায় ১ হাজার ৯০৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার এবং ২০২৪ সালে ২ হাজার ১৮৫ কোটি ৩ লাখ টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ করা হয়েছিল।

সম্প্রতি ফেনী সীমান্তে পৃথক অভিযানে প্রায় ৬৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় শাড়ি, চকোলেট ও একটি মিনিট্রাক জব্দ করে বিজিবি। একই দিনে খাগড়াছড়ির যামিনীপাড়া সীমান্তে সশস্ত্র চোরাকারবারিদের সঙ্গে বিজিবির গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। অভিযানে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৪ রাউন্ড গুলি, পাঁচ রাউন্ড এফসিসি এবং ১ হাজার ৬০০ ভারতীয় রুপি উদ্ধার করা হয়।

বিজিবির হিসাব বলছে, শুধু জুন মাসেই প্রায় ৩০৭ কোটি ৬৫ লাখ ১১ হাজার টাকা মূল্যের চোরাচালান পণ্য জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ৫ কেজি ৫৯২ গ্রাম সোনা, ১৮ হাজারের বেশি ভারতীয় শাড়ি, প্রায় ১০ হাজার তৈরি পোশাক, প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার প্রসাধনী, ১৭ লাখের বেশি আতশবাজি, পাশাপাশি চিনি, কাঠ, কয়লা, জিরা, ওষুধ, চিংড়ির পোনা ও অন্যান্য পণ্য।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দুই দেশের বাজারে পণ্যের দামের পার্থক্য, উচ্চ শুল্ক, সীমান্তের ভৌগোলিক জটিলতা এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় কর্মসংস্থানের অভাব চোরাচালান বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বৈধ পথে আমদানির তুলনায় অবৈধ পথে পণ্য আনা সহজ ও অধিক লাভজনক হওয়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চোরাচালানের পথ বেছে নিচ্ছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত এলাকায় দারিদ্র্য ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সংকটও চোরাচালান চক্রের বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি জরুরি। এ লক্ষ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে ৫৯ বিজিবির উদ্যোগে ‘সীমান্ত ডিজিটাল স্কিল সেন্টার’ চালু করা হয়েছে, যেখানে বেকার তরুণদের মোবাইল ফোন মেরামতের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চোরাচালানের কারণে শুধু সরকারের রাজস্বই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং দেশীয় শিল্প, বৈধ ব্যবসা ও সামগ্রিক অর্থনীতিও নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়ে। একই সঙ্গে সীমান্তপথ ব্যবহার করে মানবপাচার, মাদক ব্যবসা, জাল মুদ্রা সরবরাহসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।

বিজিবির অপারেশন উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমান বলেন, সীমান্তে অস্ত্র, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সীমান্তের বাস্তব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও চোরাচালানবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, চোরাচালান ও মাদক দমন শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার দায়িত্ব নয়; এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ড্রোন, থার্মাল ক্যামেরা, স্মার্ট সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা গেলে চোরাচালান প্রতিরোধ আরও কার্যকর হবে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও সময়ের দাবি।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

Facebook Comments Box