শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

আদালতের নির্দেশ না মানায় দাগনভূঞা থানার ওসিকে প্রত্যাহারের আদেশ

আদালতের নির্দেশ না মানায় দাগনভূঞা থানার ওসিকে প্রত্যাহারের আদেশ

আদালতের নির্দেশের পরও মামলা রেকর্ড না করার অভিযোগে ফেনীর দাগনভূঞা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফয়জুল আজিম নোমানকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাতে বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন আদালতের স্টেনোগ্রাফার মোহাম্মদ শামছুদ্দীন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, দাগনভূঞা উপজেলার মোমারিজপুর গ্রামের রাকিব হাসানের স্ত্রী বিবি মারজাহান শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে থানায় লিখিত আবেদন করতে যান। অভিযোগ, পুলিশ ওই আবেদন গ্রহণ করেনি। পরে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হলে বিচারক মামলাটি এফআইআর হিসেবে রেকর্ড করার নির্দেশ দেন।

তবে আদালতের ওই নির্দেশও পালন করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী। এরপর বিষয়টি জানিয়ে তিনি আদালতে ফের আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ এন এম মোর্শেদ খান দাগনভূঞা থানার ওসি ফয়জুল আজিম নোমানকে প্রত্যাহারের জন্য ফেনীর পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন।

একই সঙ্গে ঘটনার তদন্ত করে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজিকে আদালতের আদেশের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।

আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ওসি ফয়জুল আজিম নোমান দায়িত্ব পালনে তার অযোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন।

রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ

ওসি নোমানের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিজেকে দলীয় কর্মী এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে তিনি প্রভাব বিস্তার করতেন।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেকে যুবদল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দুই নেতার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বিজয়নগর থেকে প্রত্যাহারের পুরোনো ঘটনা

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ফয়জুল আজিম নোমানকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) থেকে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হয়।

এরপর ২০১৯ সালের ২৬ নভেম্বর মাদক-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাকে বিজয়নগর থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

তৎকালীন সময়ে তার শয়নকক্ষের বিছানার নিচ থেকে ৩৫০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের দাবি করা হলেও ওই ঘটনার বিস্তারিত আইনগত নিষ্পত্তির তথ্য বর্তমান প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও অভিযোগ

দাগনভূঞা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আকবর হোসেনের অভিযোগ, ওসির প্রত্যক্ষ মদদে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

তিনি বলেন, নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ওসির বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতাদের সম্মানহানি করাও তার কর্মকাণ্ডের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এখন কী হবে?

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ফয়জুল আজিম নোমানকে দাগনভূঞা থানা থেকে প্রত্যাহার করা হবে কি না এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এখন সেটিই দেখার বিষয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের পাশাপাশি মামলাটি এফআইআর হিসেবে রেকর্ড না করার অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কারণ, পুলিশের বিরুদ্ধে আদালতের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগ উঠলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের বিষয় নয়, বরং আইন ও বিচারিক আদেশের প্রতি পুলিশের আনুগত্যের প্রশ্নও তৈরি করে।

এ বিষয়ে ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

Facebook Comments Box