শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ‘ভাগ্নি-জামাই’ সিন্ডিকেটের অভিযোগ, প্রশ্নে পদায়ন ও কেনাকাটা

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ‘ভাগ্নি-জামাই’ সিন্ডিকেটের অভিযোগ, প্রশ্নে পদায়ন ও কেনাকাটা

স্বাস্থ্যখাতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও জবাবদিহি নিয়ে নানা প্রশ্নের মধ্যেই মন্ত্রণালয় ও অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কথিত সিন্ডিকেটের প্রভাব নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নতুন করে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে স্বাস্থ্যখাতে প্রশাসনিক পরিবর্তনের গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে আগের সরকারের সময়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা বেশ কিছু কর্মকর্তা ও ঠিকাদার এখনো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সক্রিয় রয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক কথিত এই গোষ্ঠীতে আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা প্রভাব বিস্তার করছেন। তাদের মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাগ্নিজামাই হিসেবে পরিচিত যুগ্মসচিব মুস্তাফিজুর রহমান এবং মুখ্যসচিবের কথিত ভাগিনা হিসেবে পরিচিত সিএমএসডির পরিচালক মোহাম্মদ শফিউর রহমানের নামও উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল দায়িত্ব নেওয়ার পর চিকিৎসকদের রোগীদের পেছনে দৌড়ানোর মতো স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলেছিলেন। তবে দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাস পর ওই উদ্যোগের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিষয়টি পুরোনো বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, স্বাস্থ্যখাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে হলে শুধু আকস্মিক পরিদর্শন বা ঘোষণা নয়, বরং প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

তাদের অভিযোগ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আগের সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অনেক কর্মকর্তা এখনো বহাল রয়েছেন। উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালক পর্যায়ের বেশ কিছু পদেও পুরোনো কর্মকর্তাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

তবে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

বিতর্কিত পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন

স্বাস্থ্যখাতে সাম্প্রতিক কিছু পদায়ন নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, গত ২২ জুন জাতীয় কিডনি হাসপাতাল থেকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়েছিল অধ্যাপক ডা. মো. মোরশেদ আলমকে। পরবর্তী সময়ে ৩০ জুলাই তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পদায়ন করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও তাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পদায়ন করা হয়েছে। এমনকি বদলি আদেশ বাতিলের পেছনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

এমএসআর কেনাকাটায় ঠিকাদার সিন্ডিকেটের অভিযোগ

স্বাস্থ্যখাতের আরেকটি বড় অভিযোগ সরকারি হাসপাতালের মেডিকেল সার্জিক্যাল রিকুইজিট (এমএসআর) কেনাকাটাকে ঘিরে। অভিযোগকারীদের দাবি, কয়েকজন ঠিকাদার একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে দরপত্রে অংশ নিয়ে প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন।

এ ক্ষেত্রে মনিরুজ্জামান ঢালী ও এমদাদ হোসেনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মনিরুজ্জামান ঢালীর সঙ্গে ঢালী সাপ্লাই লিমিটেড, ঢালী করপোরেশন, আফাসি ফার্মা, ফরচুন মেডিকেল সিস্টেমস লিমিটেড, ওয়ার্ল্ড সার্জিকেল, আনিসা করপোরেশন, স্মার্ট মেডিকেল রিক্যুইজিট অ্যান্ড ফার্মা ও ঈগন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, একই গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেওয়ায় কাগজে-কলমে প্রতিযোগিতা থাকলেও বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ একটি চক্রের হাতে চলে যায়।

রাজবাড়ী হাসপাতালে দরপত্র নিয়ে অভিযোগ

রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এমএসআর সামগ্রী কেনার দরপত্র নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একই গোষ্ঠীর পাঁচটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয় এবং সর্বনিম্ন দরদাতার তালিকায় ধারাবাহিকভাবে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোই অবস্থান করে।

অভিযোগ অনুযায়ী, দরপত্রে এমন কিছু আইটেম রাখা হয়েছিল যেগুলোর নিয়মিত চাহিদা কম। ওইসব আইটেমে দর না দিয়ে বা শূন্য দর দেখিয়ে কথিত সিন্ডিকেট সুবিধা নিয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দরপত্রের নথি, মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

আগে কালো তালিকাভুক্তির অভিযোগ

মনিরুজ্জামান ঢালীর মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান অতীতে দুই বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপরও দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে এমএসআর সামগ্রী সরবরাহের কাজ পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

জয়পুরহাট, ভোলা, রাজবাড়ী ও জামালপুর সদর হাসপাতালের বিভিন্ন কেনাকাটায় তার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশের অভিযোগও করা হয়েছে।

এমদাদ হোসেনের প্রতিষ্ঠান নিয়েও অভিযোগ

আরেক ঠিকাদার এমদাদ হোসেনের সঙ্গে মেসার্স তাহসিন এন্টারপ্রাইজ, দি প্রফেশনাল বিজনেস বিল্ডার্স ও এএইচএস প্রেসটিজ ট্রেড নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার কথা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেত্রকোনা জেলা হাসপাতালের এমএসআর সামগ্রী কেনার দরপত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ ছিল। একই ধরনের অভিযোগ মাগুরা, পটুয়াখালী, মেহেরপুর ও নড়াইলসহ আরও কয়েকটি জেলা হাসপাতালের কেনাকাটা নিয়েও রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার দাবি

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি হাসপাতালের কেনাকাটায় একই গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে দরপত্রের প্রতিটি ধাপ—শিডিউল তৈরি, দরপত্র আহ্বান, দরদাতা নির্বাচন, কারিগরি মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ প্রদান—স্বচ্ছভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠান অতীতে কালো তালিকাভুক্ত হয়ে থাকলে পরবর্তী সময়ে সরকারি কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি

স্বাস্থ্যখাতে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, শুধু কর্মকর্তা বা ঠিকাদার পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; দরপত্র, কেনাকাটা, পদায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রতিটি পর্যায়ে ডিজিটাল নজরদারি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কেন্দ্রীয় ঔষধাগার অধিদপ্তর (সিএমএসডি) এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ক্রয়সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের বক্তব্য নেওয়ার মাধ্যমে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র সামনে আনা জরুরি।

স্বাস্থ্যখাতের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ সেবায় কোনো ব্যক্তি, কর্মকর্তা বা কথিত সিন্ডিকেটের প্রভাব যেন সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে—এ জন্য কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জোরালো হচ্ছে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

Facebook Comments Box