শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

চা খাতের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বাড়বে উৎপাদন ও রপ্তানি

চা খাতের উৎপাদনশীলতা, আর্থিক সক্ষমতা ও রপ্তানি বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ঋণসুবিধা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
চা খাতের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বাড়বে উৎপাদন ও রপ্তানি

অনলাইন ডেস্ক: দেশের চা খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, উৎপাদন ব্যয় কমানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বাগানের আর্থিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার। এ লক্ষ্যে সহজ শর্তে ঋণ, সুদ কমানো, পুরোনো চা গাছের পরিবর্তে নতুন গাছ লাগানো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অব্যবহৃত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

গত মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে চা শিল্পের উন্নয়নে গঠিত মনিটরিং ও পরামর্শক কমিটির প্রথম সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল এবং বাগানভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশ চা দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। প্রথমে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ এবং এরপর রপ্তানি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে উৎপাদন ও গুণগত মান বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

বিদেশের বাজার অনুসন্ধান ও রপ্তানি বাড়াতে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, কনস্যুলেট এবং রপ্তানিসংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করা হচ্ছে। দেশীয় উৎপাদকেরা সবুজ চা, অর্থোডক্স চা, সাদা চা ও সিটিসি পদ্ধতিতে তৈরি কালো চাসহ বিভিন্ন ধরনের চা উৎপাদন করছেন।

উৎপাদন ও বাগানের সক্ষমতা

কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৭২টি চা বাগান রয়েছে। এসব বাগানের মোট জমির পরিমাণ ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮৯৬ একর। এর মধ্যে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৯১ একর চাষযোগ্য জমি এবং নার্সারিসহ ১ লাখ ৫৯ হাজার ৫৯ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে। ভবিষ্যতে চা চাষ সম্প্রসারণের জন্য ১৬ হাজার ৯২৮ একর জমি অবশিষ্ট রয়েছে।

২০২৫ সালে দেশে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড় উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৫৫২ কেজি। তবে অনেক বাগানের চা গাছ ৫০ থেকে ৬০ বছর বা তারও বেশি পুরোনো হওয়ায় উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। নতুন গাছ লাগাতে না পারা, শ্রমিকের মজুরি ও উৎপাদন উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভারত, শ্রীলঙ্কা ও কেনিয়ার তুলনায় কম উৎপাদনশীলতা উৎপাদকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় চাপ তৈরি করছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, চা খাতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তাঁর মতে, শুধু ঋণনির্ভরতার মাধ্যমে শিল্পটির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়; চা শিল্পকে নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতায় পরিচালিত হওয়ার মতো করে গড়ে তুলতে হবে।

ঋণ ও সুদ কমানোর প্রস্তাব

কমিটির প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, চা খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ১৭৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। বকেয়া ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৮২৬ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৫১৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এর মধ্যে মন্দ ঋণ ২১৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং পুনঃতফসিল করা ঋণ ৫১৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।

সম্ভাবনাময় চা বাগানের উৎপাদন ও বিনিয়োগ সচল রাখতে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল এবং যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে নতুন ঋণ দেওয়ার বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। চা উৎপাদন ও বিনিয়োগে সহায়তার জন্য ৬ শতাংশ সুদে আবর্তক তহবিল গঠনের প্রস্তাবও এসেছে। পাশাপাশি চা উৎপাদনে নেওয়া ঋণের সুদের হার ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশে আনার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।

চা চাষকে কৃষিপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও সভায় আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ চা বোর্ড এ প্রস্তাবের পক্ষে থাকলেও শিল্প মন্ত্রণালয় আপত্তি জানিয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সৌরবিদ্যুৎ ও রপ্তানি সম্প্রসারণ

চা চাষের অনুপযোগী জমিতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যৌথভাবে বাণিজ্যিক সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে কমিটি। তবে এ ক্ষেত্রে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিকল্প বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ১৬ লাখ ৪০ হাজার কেজি চা রপ্তানি করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চা রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৩ লাখ মার্কিন ডলার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ৭ লাখ ৮০ হাজার ডলার।

রপ্তানি বাড়াতে অর্থোডক্স ও বিশেষায়িত চায়ের উৎপাদন, ব্র্যান্ডিং ও প্যাকেজিং, কার্যকর বিপণন এবং আন্তর্জাতিক মানসনদ অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি বাগানগুলোর নিজস্ব ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে।

সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

Facebook Comments Box