শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

বৈশ্বিক আবহাওয়ায় বড় প্রভাব ফেলছে ‘এল নিনো’

এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানল, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও অতিবৃষ্টির মতো চরম আবহাওয়া দেখা দিচ্ছে।
বৈশ্বিক আবহাওয়ায় বড় প্রভাব ফেলছে ‘এল নিনো’

অনলাইন ডেস্ক: বিশ্বের আবহাওয়া বদলে দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ‘এল নিনো’ গত কয়েক মাস ধরে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এরই মধ্যে এটি বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। চরম আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সঙ্গে সংগতি রেখে ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতে ভয়াবহ দাবানল, নজিরবিহীন বন্যা ও তীব্র ঘূর্ণিঝড় দেখা দিচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউএমও) বরাত দিয়ে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেকর্ড গড়া এই এল নিনো আরও শক্তিশালী হতে পারে। এটি অন্তত ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এল নিনোর প্রভাব

‘এল নিনো’ হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত প্রক্রিয়া। সমুদ্রের পানি অতিরিক্ত উষ্ণ হলে বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বদলে যায়। এর ফলে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চরম খরা ও দাবানল এবং আমেরিকা অঞ্চলে বন্যা ও শক্তিশালী সামুদ্রিক ঝড় দেখা দিতে পারে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এল নিনোর প্রভাবে ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া শুষ্ক ও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এ বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে অন্তত ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৬৫৭ হেক্টর জমি দাবানলে পুড়ে গেছে, যা গ্রেটার লন্ডনের আয়তনের প্রায় ছয় গুণ। গত বছরের তুলনায় এ বছর দাবানলে পোড়া ভূখণ্ডের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে।

দাবানলের কারণে ইন্দোনেশিয়ার স্কুল বন্ধ করতে হয়েছে এবং হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। সুমাত্রা ও কালিমান্তানের লাখ লাখ মানুষ বিষাক্ত ধোঁয়াশার মুখে পড়েছে। সেখানে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪০ হাজারের বেশি শিশু কাশি, ব্রঙ্কাইটিস ও নিউমোনিয়ায় ভুগছে।

ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা

পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে বাতাসের গতি কমেছে। এতে ঝড়গুলো দ্রুত শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ২২টি ঝড় ও ১২টি হ্যারিকেন তৈরি হয়েছে, যার ১০টি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। মৌসুম শেষ হতে দুই মাস বাকি থাকলেও গড়ে যতগুলো হ্যারিকেন তৈরি হয়, সেই রেকর্ড ইতোমধ্যে ছাড়িয়ে গেছে।

এল নিনোর উষ্ণ পানির প্রভাবে হ্যারিকেন পলো দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ঘণ্টায় ২৮৫ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া সৃষ্টি করে। একই সময়ে ওই অঞ্চলে ‘ওদালিস’ ও ‘নোলো’ নামে আরও দুটি হ্যারিকেন অবস্থান করছিল। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে ‘মেসাক’ ও ‘দুজিয়ান’-এর মতো ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে পূর্ব চীন ও জাপানের বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা ও ভূমিধস হয়েছে।

জাপান মেটিওরোলজিক্যাল এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে এ বছর ১০টি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়েছে, যা ১৯৬৬ সালের পর এক মৌসুমে সর্বোচ্চ। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বছরের বাকি সময়ে আরও টাইফুন তৈরি হতে পারে এবং এতে চীন ও জাপানে নতুন করে দুর্যোগ দেখা দিতে পারে।

অন্যদিকে, উত্তর আটলান্টিকে এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট প্রবল বাতাস ঝড় তৈরিতে বাধা দিচ্ছে। এ মৌসুমে সেখানে কেবল ‘ইসায়াস’ নামের একটি হ্যারিকেন তৈরি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও অ্যালাবামায় আঘাত হেনেছে। এ বছর এখন পর্যন্ত সেখানে আটটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় দেখা গেছে।

ভারতে বৃষ্টির ঘাটতি

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাবে ভারতেও আবহাওয়া শুষ্ক ও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কৃষিকাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কম হয়েছে। পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে ২৬ শতাংশ এবং দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে ২৪ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ‘ব্যতিক্রমী খরা’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ অনাবৃষ্টির পর কোথাও কোথাও হঠাৎ অতিবৃষ্টিও হয়েছে, ফলে কৃষিপণ্যের উৎপাদনে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা বেড়েছে।

সূত্র: Daily Amader Matribhumi

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

Facebook Comments Box