
অনলাইন ডেস্ক: গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের (জিসিসি) অঞ্চল-৫-এর রাজস্ব কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. জাকির হোসেনের চাকরিজীবনের সূচনা হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ৪৭৫ টাকা মাসিক বেতনে। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় সরকারি চাকরিতে অতিবাহিত করার পর তার দৃশ্যমান সম্পদ, ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা ও জীবনযাপন নিয়ে এখন তৈরি হয়েছে নানামুখী বিতর্ক ও প্রশ্ন। রাজধানীর উত্তরা ও গাজীপুরের টঙ্গীতে ফ্ল্যাট, আলিশান বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের মহার্ঘ্য গাড়িসহ বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তার বৈধ আয় ও অর্জিত সম্পদের সামঞ্জস্যতা নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার মধুপুর গ্রামের মো. মোহাব্বত আলীর ছেলে জাকির হোসেন ১৯৯৩ সালের ২৫ অক্টোবর রামগঞ্জ পৌরসভায় কর নির্ধারক পদে স্থায়ীভাবে যোগ দেন। তৎকালীন নথি অনুযায়ী, তার প্রথম বেতন ছিল ১ হাজার ৪৭৫ টাকা। ১৯৯৫ সালের ১ আগস্ট তিনি কর নির্ধারক হিসেবে তৎকালীন টঙ্গী পৌরসভায় যোগ দেন। তখন তার মূল বেতন ছিল ১ হাজার ৮৩৫ টাকা। বর্তমানে অঞ্চল-৫-এর রাজস্ব কর্মকর্তার চলতি দায়িত্বে তার প্রাপ্ত বেতন আনুমানিক ৪৮ হাজার টাকা।
রাজস্ব বিভাগের আওতায় হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ ও আদায়, বকেয়া কর সংগ্রহ, নতুন হোল্ডিং নম্বর প্রদান, বাজার ও দোকান থেকে রাজস্ব আদায় এবং বিজ্ঞাপন ও সাইনবোর্ড ফি সংগ্রহের মতো কাজ রয়েছে। ফলে এই পদে থাকা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা আর্থিক অনৈতিকতার অভিযোগ ওঠায় প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ফ্ল্যাট, ভবন ও ব্যবসা নিয়ে অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজধানীর উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের ১৬ নম্বর রোডের একটি সাততলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় পাশাপাশি থাকা দুটি ফ্ল্যাট জাকির হোসেনের মালিকানাধীন। প্রায় ১ হাজার ৯৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটে তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন এবং অন্যটি ভাড়া দেওয়া রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দুটি ফ্ল্যাটের সম্মিলিত মূল্য আনুমানিক দুই কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
টঙ্গীর দেওড়া এলাকায় জমিসহ একটি ছয়তলা ভবনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়। জাকির হোসেন নিজে ২০০১ সালে দেওড়া এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণের কথা স্বীকার করেছেন।
এ ছাড়া টঙ্গীর হোসেন মার্কেট এলাকায় ‘জাকিয়া টাইলস অ্যান্ড স্যানিটারি’ নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। নথিপত্রে প্রতিষ্ঠানটি তার স্ত্রী জাহানারা বেগমের নামে থাকলেও জাকির হোসেনই এটি নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকা নিষিদ্ধ।
অভিযোগকারীরা তার ব্যবহৃত সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসের কথাও উল্লেখ করেছেন। ঢাকা মেট্রো-গ-৩৯-৯৩৭১ নম্বরের ওই গাড়িটির আনুমানিক বাজারমূল্য ৫০ লাখ টাকার বেশি বলে দাবি করা হয়েছে। গাজীপুর ও আশপাশে জাকির হোসেন ও তার স্ত্রীর নামে আরও অঘোষিত সম্পত্তি রয়েছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে।
দুদকে অভিযোগ ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে দাবি
২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর দুদকের গাজীপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে জিসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। এতে টঙ্গী পৌরসভায় দায়িত্ব পালনের সময় বাড়িঘরের কর নির্ধারণে অনিয়ম করে অবৈধ অর্থ উপার্জন, অভ্যন্তরীণ বদলি ও অসদাচরণের জন্য একাধিকবার শোকজ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। অভিযোগে সালনা অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকালে টঙ্গী এলাকার কর নির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং স্থানীয় সরকার ও রাজস্ব অডিটে আর্থিক আপত্তির কথাও বলা হয়।
অভিযোগপত্রে বিদেশে মেয়েকে পড়াশোনা করানো, যুক্তরাষ্ট্রে ফ্ল্যাট কেনা এবং উত্তরার ফ্ল্যাট ও গাড়ির ছবি সংযুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে অভিযোগের পর দুদক কোনো দৃশ্যমান অনুসন্ধান চালিয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
এদিকে একটি ছবিতে তাকে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গে দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগের আমলে নিজেকে দলটির অনুসারী পরিচয় দেওয়া জাকির হোসেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি ঘরানার পরিচয় দিতে শুরু করেছেন।
অভিযোগ সম্পর্কে জাকির হোসেন দেওড়ায় ২০০১ সালে জমি কিনে বাড়ি নির্মাণের কথা স্বীকার করেন। তবে উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের ফ্ল্যাট দুটি এবং ‘জাকিয়া টাইলস অ্যান্ড স্যানিটারি’র সঙ্গে সম্পৃক্ততার দাবি তিনি অস্বীকার করেন। মাইক্রোবাসের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। রাজস্ব অডিটের আর্থিক আপত্তি সম্পর্কে তিনি বলেন, যথাসময়ে সব আপত্তির লিখিত জবাব দিয়েছেন।
জাকির হোসেনের দৃশ্যমান সম্পদ, ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা ও জীবনযাপনের সঙ্গে তার আইনি আয়ের সামঞ্জস্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে।
সূত্র: Daily Amader Matribhumi





মন্তব্য করুন