শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

শেরপুর সীমান্তে হাতি-মানুষের সংঘাত নিরসনে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

শেরপুরের গারো পাহাড়ে বন্য হাতি ও মানুষের সংঘাত বাড়ছে। বন বিভাগের নজরদারি, হাতির চলাচলের পথ সংরক্ষণ ও স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তায় সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
শেরপুর সীমান্তে হাতি-মানুষের সংঘাত নিরসনে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

অনলাইন ডেস্ক: শেরপুরের গারো পাহাড় এলাকায় বন্য হাতি ও মানুষের সংঘাত দিন দিন বাড়ছে। এই সংঘাত নিরসনে বন বিভাগের নজরদারি বৃদ্ধি এবং সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রশাসনের সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।

বাংলাদেশ এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের প্রশিক্ষক আদনান আজাদ বলেন, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাতির নিরাপদে বেঁচে থাকার পরিবেশ গড়ে তুলতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। হাতি লোকালয়ে ঢুকলে আতঙ্কিত হয়ে ঘিরে ধরা, আঘাত করা বা অনিরাপদভাবে তাড়ানোর চেষ্টা না করে প্রশিক্ষিত রেসপন্স টিমের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। স্থানীয় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বন বিভাগের সঙ্গে মানুষের সমন্বয় জোরদার করেও সংঘাত কমানো সম্ভব বলে জানান তিনি।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সীমান্তবর্তী তিন উপজেলার বনাঞ্চল ও আশপাশে প্রায় ১২০টি বন্য হাতি বিচরণ করছে। প্রতিটি দলে রয়েছে ৩০ থেকে ৪০টি হাতি। খাদ্যের সন্ধানে হাতির পাল প্রায়ই লোকালয় ও কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ায় ফসল ও ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে হাতিরাও নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র হারাচ্ছে।

নালিতাবাড়ী উপজেলার কাটাবাড়ি, মধুটিলা, ঝিনাইগাতী উপজেলার তাওয়াকুচি, ছোটো গজনী ও বড় গজনী এবং শ্রীবরদী উপজেলার বালিজুড়ী ও রানী শিমুল ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকাসংলগ্ন বনাঞ্চলে হাতির বিচরণ রয়েছে। বর্তমানে হাতির দলগুলো নালিতাবাড়ীর বুরুঙ্গা-পোড়াবাড়ি পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থান করছে।

মধুটিলা রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার মো. আব্দুল করিম জানান, হাতিগুলো কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে শেরপুর ও জামালপুরের প্রায় ১২ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল এবং আশপাশে বিচরণ করছে। এসব দলে ২৫ থেকে ৩০টি শাবক রয়েছে। বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত খাবার না থাকায় হাতিরা কৃষিজমি ও লোকালয়ে প্রবেশ করছে বলে জানান তিনি।

২০০০ সালের দিকে ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে ১৫ থেকে ২০টি বন্যহাতি বাংলাদেশের গারো পাহাড় এলাকায় আসে। পরে বংশবিস্তারের মাধ্যমে সংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০০৭ সালে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের সময় হাতির চলাচলের জন্য ৪৪টি গেট ও নদী-ছড়ার ওপর ১১টি আন্ডারপাস তৈরি করা হলেও গেটগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাতির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় বলে সূত্র জানায়।

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, রাতে ফসল পাহারা দিতে গিয়ে তাদের আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। টর্চলাইট, আগুনের আলো ও দলবদ্ধভাবে হাঁকডাক করেও অনেক সময় হাতির পাল ঠেকানো যায় না। ঝিনাইগাতীর কৃষক সুনীল মারাক ফসল রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণের আহ্বান জানিয়েছেন। নালিতাবাড়ীর কৃষক চিন্ময় ম্রং নিয়মিত নজরদারি, আগাম সতর্কবার্তা ও স্থানীয় মানুষের প্রশিক্ষণ চেয়েছেন। শ্রীবরদীর কৃষক হারেজ আলী হাতির চলাচলের পথ সংরক্ষণ, বনের খাদ্য ও আবাসস্থল উন্নয়ন এবং বন বিভাগের সঙ্গে গ্রামবাসীর সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

ময়মনসিংহ বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেরপুরে সংঘাতের ঘটনায় প্রায় ৪৩৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত হাতির আক্রমণে ২৯ জন নিহত ও ২৬ জন আহত হয়েছেন। গাছপালাসহ ৮২৯টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, মানুষের তৈরি বৈদ্যুতিক ফাঁদসহ বিভিন্ন কারণে ৩০টি বন্যহাতির মৃত্যু হয়েছে।

বন বিভাগ জানায়, নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ৫৫ লাখ টাকা, আহতদের পরিবারকে ৯ লাখ টাকা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের পরিবারগুলোকে ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি সংঘাত প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

গত ১০ অক্টোবর মধুটিলা ইকোপার্কে এক আলোচনায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, বিদ্যমান প্রটোকলের আওতায় ভারতের সঙ্গে আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। হাতির স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে সীমান্তের গেট খুলে দেওয়ার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হবে বলেও তিনি জানান।

হাতির চলাচলের পথ সংরক্ষণ, বনাঞ্চলের উন্নয়ন, সীমান্তের গেট নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা, আগাম সতর্ক ব্যবস্থা এবং স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

Facebook Comments Box