
অনলাইন ডেস্ক: ঢাকা, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ (বাসস): জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বুঝতে তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্থান, মানুষ ও স্মৃতির কাছে ফিরে দেখা জরুরি। ময়মনসিংহের ত্রিশাল তেমনই এক স্থান, যেখানে কবি এসেছিলেন কিশোর বয়সে এবং যে সময়ের অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যকর্মে নানা অনুরণন তৈরি করে।
ত্রিশালে নজরুল কবি হয়ে আসেননি; এসেছিলেন চৌদ্দ বা পনেরো বছর বয়সী কিশোর হিসেবে। ত্রিশালজীবনের মধ্য দিয়ে তিনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের মানুষ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে পরিচিত হন। তাঁর জীবনের এই অধ্যায়কে শুধু স্মৃতিচিহ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সেই সময়ের সামাজিক পরিবেশ, বেড়ে ওঠা ও জীবনসংগ্রামের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি করে তাঁর গল্প ‘অগ্নিগিরি’.
‘অগ্নিগিরি’ গল্পের পটভূমি ত্রিশাল। গল্পে ত্রিশালের মাদ্রাসা, গফরগাঁওয়ের জমিদারের হাতি এবং ময়মনসিংহের হাসপাতালের মতো বাস্তব অনুষঙ্গ রয়েছে। গল্পের ‘বীররামপুর’ মূলত বাস্তবের দরিরামপুর গ্রামকে নির্দেশ করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নজরুল ত্রিশালে থাকার সময় নামাপাড়ার বিচ্যুতিয়া ব্যাপারীবাড়িতে জায়গির ছিলেন। বাড়িটির পাশের ছলিমপুর গ্রামের মানুষ একটি বটগাছ পেরিয়ে দরিরামপুর বাজারে যাতায়াত করতেন। এই ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে ‘অগ্নিগিরি’ গল্পের বর্ণনার মিল রয়েছে। গল্পের সবুর, নূরজাহান ও রুস্তম চরিত্রের সঙ্গে কবির ত্রিশালজীবনের সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়েও পাঠকের আগ্রহ তৈরি হয়। তবে এই মিলের ভিত্তিতে সবুরকে কবির আত্মপ্রতিকৃতি বলা নিশ্চিত নয়।
নজরুল ১৯১৪ সালের জুনে দারোগা রফিজউল্লাহর সঙ্গে ত্রিশালে আসেন। তিনি দরিরামপুর ইংরেজি হাইস্কুলে ভর্তি হন, যা বর্তমানে নজরুল একাডেমি নামে পরিচিত। প্রথমে কাজীর শিমলা গ্রামে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়। বিদ্যালয়টি সেখান থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় প্রতিদিন তাঁকে হেঁটে যাতায়াত করতে হতো। পরে নামাপাড়া গ্রামের কাজী হামিদুল্লাহর বাড়ি এবং এরপর বিচ্যুতিয়া ব্যাপারীবাড়িতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়।
বাড়ি বদল, জায়গির থাকার অভিজ্ঞতা এবং এক আশ্রয় থেকে অন্য আশ্রয়ে যাওয়ার বাস্তবতা তাঁর কৈশোরের বেড়ে ওঠার অংশ ছিল। ত্রিশালের দিনগুলোতে ময়মনসিংহের প্রকৃতি ও আতিথেয়তার পাশাপাশি নিঃসঙ্গতা ও তিক্ত অভিজ্ঞতাও ছিল। স্থানীয় বালকদের উত্ত্যক্ত করা এবং গান, বাঁশি বাজানো ও পরীক্ষায় ভালো ফলের কারণে সহপাঠীদের ঈর্ষার মতো ঘটনাও তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছিল।
১৯২৬ সালে গফরগাঁওয়ের প্রজা সম্মিলনীতে পাঠানো চিঠিতে নজরুল ময়মনসিংহের মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর ঋণ এবং শৈশবের স্মৃতি স্মরণ করেন। ‘অগ্নিগিরি’ গল্পের মাধ্যমে তিনি ত্রিশালের পরিচিত ভূমি, মানুষ ও ফেলে আসা দিনগুলোকে সাহিত্যে সংরক্ষণ করেছেন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লেখক মাওলা প্রিন্সের মতে, ত্রিশাল অধ্যায় বাদ দিয়ে নজরুলের জীবন বিচার করা যায় না। তাঁর ভাষায়, নজরুল ত্রিশালে এসেছিলেন ‘মানুষ হতে’ এবং ময়মনসিংহ জেলার কাছে তিনি ‘অশেষ ঋণে ঋণী’। ‘অগ্নিগিরি’, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁকে লেখা চিঠি এবং গফরগাঁও নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মেলনে পাঠানো অভিভাষণে ত্রিশালকেন্দ্রিক স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার পরিচয় পাওয়া যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কাজীর শিমলায় দারোগা রফিজউল্লাহর বাড়ি এবং নামাপাড়ায় বিচ্যুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে দুটি নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে কবির স্মারক, আলোকচিত্র ও বই সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। দরিরামপুর হাইস্কুল বর্তমানে নজরুল একাডেমি নামে পরিচিত। ২০০৬ সালে ত্রিশালে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। একই বছর বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও নজরুল ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ‘নজরুল পর্যটন’ কর্মসূচি চালু হয়।
প্রতিবছর নজরুলের জন্মজয়ন্তীতে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নজরুল মেলার আয়োজন করা হয়। তবে স্মৃতিকেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, নতুন নিদর্শন সংগ্রহ এবং গবেষণামূলক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাওলা প্রিন্স স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি ও স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে ঢাকাস্থ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট এবং ত্রিশালস্থ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়কে যৌথভাবে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। তাঁর মতে, দায়িত্বপ্রাপ্তদের দক্ষতা, আন্তরিকতা, নজরুলের প্রতি অনুরাগ এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব স্থাপনাকে সর্বসাধারণের সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)
সম্পাদক: মোঃ আহছানউল্যা হাসান, নির্বাহী সম্পাদক: মুরাদ হোসেন, বার্তা সম্পাদক: রাসেল গাজী, মোবাইল: 01911110129
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয: ২১, নাছিম চেম্বার, ৩য় তলা, দিলকুশা, মতিঝিল, ঢাকা।
© ২০২৫ জনমুক্তি বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত