শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

কাজ শেষ না করেই ১০ কোটি টাকা বিল পেল আকরাম খানের প্রতিষ্ঠান

কাজ শেষ হওয়ার আগে ডিএনসিসির সড়কবাতির দুটি প্রকল্পে প্রোটেস্টার লিমিটেডকে ১০ কোটি ৬৯ লাখ টাকার বিল দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
কাজ শেষ না করেই ১০ কোটি টাকা বিল পেল আকরাম খানের প্রতিষ্ঠান

অনলাইন ডেস্ক: কাজ শেষ হওয়ার আগেই একটি প্রতিষ্ঠানকে ১০ কোটি টাকার বেশি বিল পরিশোধ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। সড়কবাতির দুটি কাজের বিপরীতে ‘প্রোটেস্টার লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে এই বিল দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান। দরপত্র প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম, অভিজ্ঞতা জালিয়াতি এবং মালামাল বুঝে পাওয়ার আগেই বিল ছাড়ের এই ঘটনায় করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

ডিএনসিসির নথি অনুযায়ী, গত ৩০ জুন কাজ শেষ হওয়ার আগেই দুই প্রকল্পে মোট ১০ কোটি ৬৯ লাখ ৪৩ হাজার ২১৮ টাকার বিলের ফাইলে স্বাক্ষর করা হয়। আয়কর ও ভ্যাট বাদ দেওয়ার পর নিট পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ কোটি ১৮ লাখ ৭৩ হাজার ৯৪৭ টাকা। অঞ্চল-৫-এর প্রকল্পে কাজের ভৌত অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ২৯ শতাংশ। দুটি কাজের মোট প্রাক্কলিত দর প্রায় সাড়ে ৩৫ কোটি টাকা।

দরপত্রে অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন

অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণে প্রোটেস্টার রাজশাহী সিটি করপোরেশনের একটি অসম্পন্ন কাজের সনদ জমা দিয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ওই কাজের মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত থাকায় দরপত্র জমার সময় সেটি চলমান ছিল। সরকারি ক্রয় বিধিমালা-২০০৮ (পিপিআর)-এর বিধি ১১১৮ ও বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (পিপিএ) নির্দেশনা লঙ্ঘন করে পরে সাধারণ কাজের সনদ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

অঞ্চল-৩-এর ১৪ কোটি ২০ লাখ টাকার কাজ এবং অঞ্চল-৫-এর ২১ কোটি ১৯ লাখ টাকার কাজ—দুটিতেই একই অসম্পন্ন সনদ ব্যবহার করা হয়। অঞ্চল-৫-এর কাজের জন্য গত বছরের ১৯ নভেম্বর কার্যাদেশ এবং ৪ ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

অগ্রগতি কম হলেও বিল পরিশোধ

অঞ্চল-৫-এর প্রকল্পে প্রথম ও চলতি বিল হিসেবে ৬ কোটি ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৯৫৮ টাকার প্রস্তাব করা হয়। ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ৮৫ লাখ ৩১ হাজার ৭৫৮ টাকা বাদ দিয়ে নিট ৫ কোটি ২০ লাখ ১৬ হাজার ২০০ টাকা প্রোটেস্টারের যমুনা ব্যাংক পিএলসির উত্তরা শাখার হিসাবে পরিশোধ করা হয়। নথিতে কাজের অগ্রগতি ২৯ শতাংশ দেখানো হলেও মালামাল ও কাজ সম্পূর্ণ বুঝে নেওয়ার আগেই বিলের ফাইলে কর্মকর্তারা স্বাক্ষর করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অঞ্চল-৩-এর কাজের বিপরীতে ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৯৫ হাজার ২৬০ টাকার বিল অনুমোদন করা হয়। ভ্যাট ও আয়কর বাদ দেওয়ার পর নিট ৩ কোটি ৯৮ লাখ ৫৭ হাজার ৭৪৭ টাকা পরিশোধ করা হয়। অঞ্চল-৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জানান, মালামাল রাখার জায়গা না থাকায় সেগুলো ঠিকাদারের হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং বৈদ্যুতিক পোলের ঢালাই চলছে। তবে এ বিষয়ে দাপ্তরিক অনুমতিপত্র আছে কি না, সে প্রশ্নের সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলীর একটি পদ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে পদটি পরিচালনা করা হচ্ছে। এই ব্যবস্থার আড়ালে দরপত্র ও কাজের তদারকিতে অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

চীন সফর নিয়েও সমালোচনা

‘স্মার্ট এলইডি স্ট্রিট লাইট অ্যান্ড ডেকোরেটিভ পোল’-এর ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট ও প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রশিক্ষণের কথা বলে ডিএনসিসি ও স্থানীয় সরকার বিভাগের ১০ কর্মকর্তার চীন সফর অনুমোদিত হয়। তবে বাস্তবে দুই দফায় পরিবারসহ মোট ২২ জন সফর করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে প্রশাসনিক মহলে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

প্রোটেস্টার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আকরাম খান দাবি করেন, কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি এবং নিয়ম অনুসারেই প্রথম বিল পরিশোধ করা হয়েছে। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম জানান, সব প্রক্রিয়া আইনি নিয়ম মেনে হওয়ার কথা; প্রশ্ন উঠলে করপোরেশন বিষয়টি যাচাই করবে। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সূত্র: Daily Amader Matribhumi

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

Facebook Comments Box