
অনলাইন ডেস্ক: ঝিনাইদহে সার ডিলারশিপ নিয়োগে মোটা অঙ্কের অর্থবাণিজ্য, আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন, সীমাহীন অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক অ্যাডভোকেট এম. এ. মজিদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজের ভাই, শ্যালক, শ্যালকের স্ত্রী ও বাড়ির কাজের লোককে সার ডিলারশিপ পেতে সহযোগিতা করেছেন। এ নিয়ে জেলাজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে নতুন ডিলারদের তালিকা প্রকাশের পর সচেতন মহল, বিএনপির নেতাকর্মী ও ফ্যাসিবাদবিরোধীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনোনীত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচিতি ও কর্মকাণ্ডের ছবি ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা বাড়ে।
প্রকাশিত তালিকা ও নীতিমালার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে অভিযোগ করা হয়েছে, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারী কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের নিকটাত্মীয় ডিলারশিপ পাওয়ার অযোগ্য। অথচ হরিণাকুণ্ডুর দৌলতপুর ইউনিয়নে সালেহা বেগম মহিলা কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষক আনিচুরের স্ত্রী আনোয়ারা নাসরিনকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। তাঁর মেয়ে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। বিষয়টিকে নীতিমালার লঙ্ঘন বলে দাবি করা হচ্ছে।
মনোনীত অধিকাংশ ডিলারের উপযুক্ত সারগুদাম বা পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা নেই বলেও অভিযোগ উঠেছে। ভুয়া ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট ও মিথ্যা তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ইউনিয়নের আমির হোসেনের নিজস্ব গুদাম ও আর্থিক সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও জালিয়াতির মাধ্যমে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক শাহেদ আহমেদ দাবি করেছেন, পাগলাকানাই ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া রাকিব হাসান বন্ধন সক্রিয় ছাত্রলীগ কর্মী। স্থানীয় বিএনপি পরিবারের সদস্য সাকিব হোসেন অভিযোগ করেছেন, হরিণাকুণ্ডুর চাঁদপুর ইউনিয়নে ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও ৮ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে।
তালিকায় হরিণাকুণ্ডুর চাঁদপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সভাপতি এম. এ. মজিদের ভাই আব্দুল লতিফ এবং জোড়াদহ ইউনিয়নে ওএমএস ডিলার লাল্টু মিয়ার নাম রয়েছে। মহেশপুরে উপজেলা যুবলীগের সভাপতির ভাই, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনার শ্যালক এহসান রেজা, স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ির কেয়ারটেকার হাবিবুর রহমান বুল্লা, আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য সবুর খান ও শাকিল রিয়াজ শুভর নামও তালিকায় রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
কালীগঞ্জের ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নে এম. এ. মজিদের শ্যালকের স্ত্রী সুরমা হাসান এবং শিমলা-রোকনপুর ইউনিয়নে তাঁর চাচাতো শ্যালক নাজমুল হক মিশুর নাম রয়েছে। সদর উপজেলার সাধুহাটী ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে মজিদের কর্মচারী আনোয়ার হোসেনকে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দবির হোসেন উদ্দীন বিশ্বাস অভিযোগ করে বলেন, জেলা পর্যায় থেকে সব নিয়ন্ত্রণের কারণে ত্যাগী নেতাকর্মীরা বাদ পড়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা খালেদ সাইফুল্লাহর দাবি, অর্থবাণিজ্যের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসহ অনেক অযোগ্য মানুষ নিয়োগ পেয়েছেন।
তবে স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনা। তিনি বলেন, তাঁর শ্যালক জেলা বিএনপির দায়িত্বশীল পদে থাকায় তাঁকে আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য বলা ভিত্তিহীন। পুরো তালিকা কীভাবে বা কার মাধ্যমে হয়েছে, সে বিষয়ে তাঁর জানা নেই।
হরিণাকুণ্ডুর ইউএনও প্রদীপ্ত রায় দীপন জানান, কোনো সার ডিলারের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন তাঁর কাছে পৌঁছায়নি। তিনি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাবেন। জেলা প্রশাসক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি নোমান হোসেনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি। এম. এ. মজিদেরও কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি সার ডিলারশিপ নিয়োগে ৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা দুর্নীতির অভিযোগ তুলে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ছাত্রদল নেতা রাফিকুল ইসলাম রাফি। ফোনালাপটি ভাইরাল হওয়ার পর তিনি দলীয় পদ থেকে বহিষ্কৃত হন। রাফির দাবি, সত্য প্রকাশ করায় তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং এম. এ. মজিদ ক্ষমতা ব্যবহার করে সার ডিলারশিপ নিয়োগে অনিয়ম করেছেন।
সূত্র: Daily Amader Matribhumi





মন্তব্য করুন