
অনলাইন ডেস্ক: একসময় দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে পরিচিত ও প্রভাবশালী নাম ছিল কেয়া গ্রুপ। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে দুই হাজারের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সাবান, ডিটারজেন্ট ও প্রসাধনীর বিজ্ঞাপন টেলিভিশন ও রেডিওতে নিয়মিত প্রচারিত হতো। জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সেই কেয়া গ্রুপ এখন ব্যবসায়িক সংকট, বিপুল খেলাপি ঋণ এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে আলোচনায় রয়েছে।
সংকটের সর্বশেষ চিত্র দেখা গেছে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণায়। গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর ২০২৬) গ্রুপটির চারটি প্রতিষ্ঠান থেকে মোট ৭৩৯ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো কেয়া গ্রুপের নিট কম্পোজিট ডিভিশন, স্পিনিং ডিভিশন, কটন ডিভিশন এবং কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেড।
কর্মীদের দেওয়া নোটিশে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং জটিলতা, গ্যাস বিল বকেয়া থাকায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবলের কারণে উৎপাদন ও প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ কারণে বিভিন্ন বিভাগ ও শাখার কিছু পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে।
জনপ্রিয় ব্র্যান্ড থেকে আর্থিক সংকট
কেয়া ব্র্যান্ডের সাবান নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। দুই হাজারের দশকের শুরুর দিকে এটি দেশের পরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর একটি হয়ে ওঠে। ২০০১ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর কেয়া কসমেটিকস বিনিয়োগকারীদের কাছেও পরিচিতি পায়। প্রতিষ্ঠানটি পাঁচবার জাতীয় রপ্তানি পুরস্কার পেয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক হিসাব, ব্যাংকঋণ ও পুঁজিবাজারসংক্রান্ত নানা অভিযোগ সামনে আসে। পুঁজিবাজারে কারসাজি, আর্থিক প্রতিবেদনে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার এবং ঋণসংক্রান্ত জালিয়াতির অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে তদন্ত ও মামলা হয়েছে। এসব অভিযোগের সবগুলোর চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
ব্যাংকঋণ নিয়ে মামলা
কেয়া গ্রুপের উদ্যোক্তা আবদুল খালেক পাঠান দুদকের একটি মামলায় ২০১৭ সালে প্রথম গ্রেপ্তার হন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে ২০১১ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখা থেকে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ১১১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে মামলাটি করা হয়।
এরপর গত বছরের শুরুতে দুদক আরও দুটি মামলা করে। এর মধ্যে ৫২৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা একটি মামলায় আবদুল খালেক পাঠান ও সাউথইস্ট ব্যাংকের পাঁচ কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়। দুদকের অভিযোগ, যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ঋণ নেওয়া হয়েছিল।
২০২১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দুদক আবদুল খালেক পাঠান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে পাঁচটি পৃথক ফৌজদারি মামলা করে। এসব মামলায় অর্থ পাচার, ১৮৪ কোটি টাকার অবৈধ ও হিসাববহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদন ও খেলাপি ঋণ
২০২০ সালে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল কেয়া গ্রুপের আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে তদন্ত করে। অভিযোগ ছিল, প্রকৃত সম্পদের তুলনায় এক হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পদ দেখানো হয়েছে এবং মুনাফাও বাড়িয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বরে বিএসইসি কেয়া গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে বিশেষ নিরীক্ষার নির্দেশ দেয়।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কেয়া কসমেটিকসের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। সোনালী, ন্যাশনাল, সাউথইস্ট, সোশ্যাল ইসলামী, স্ট্যান্ডার্ড ও প্রিমিয়ার ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক এবং জিএসপি ফাইন্যান্স ও ইউনিয়ন ক্যাপিটাল থেকে এসব ঋণ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুনঃতফসিলের প্রক্রিয়ায় থাকার দাবি
খেলাপি ঋণের বিষয়ে কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মো. নূর হোসেন বলেন, প্রতিষ্ঠানটি ঋণ পুনঃতফসিলের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এককালীন অর্থ পরিশোধ অথবা তিন কিস্তিতে পরিশোধের বিষয়ে আবেদন করার প্রক্রিয়া এগিয়েছে বলেও জানান তিনি।
এফআরসির প্রতিবেদন ও বিএসইসির বিশেষ নিরীক্ষা সম্পর্কে তিনি বলেন, বিএসইসির নিয়োগ করা নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিরীক্ষা হয়েছে এবং প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনো তাঁরা হাতে পাননি বলে জানান তিনি।
কেয়া গ্রুপের ৭৩৯ কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে। ঋণ পুনঃতফসিল, চলমান তদন্ত এবং আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: Daily Amader Matribhumi





মন্তব্য করুন