
অনলাইন ডেস্ক: দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু উদ্বেগজনক পর্যায়ে থাকায় রোগটির বিস্তার রোধে সরকার ও ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মশকনিধন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসাসেবার প্রস্তুতি জোরদার করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শুধু ওষুধ ছিটানো বা পরিচ্ছন্নতা অভিযান নয়, এডিস মশার প্রকৃত প্রজননস্থল শনাক্ত করে ধ্বংস, কীটনাশকের কার্যকারিতা যাচাই এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১২ হাজার ৪০০ জন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৬ হাজার ২৬ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে ৩৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেছেন, অক্টোবর ও নভেম্বরেও ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক থাকতে পারে। নভেম্বর মাসে প্রকোপ কিছুটা কমলেও উল্লেখযোগ্য উন্নতির জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। এ কারণে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
তার মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপ হলো এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করা। কোথায় মশা বংশবিস্তার করছে, কোন ধরনের স্থানে লার্ভা বেশি পাওয়া যাচ্ছে এবং ব্যবহৃত কীটনাশক কতটা কার্যকর—এসব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রজননস্থল শনাক্ত না করে নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, বেজমেন্ট, পার্কিং এলাকা, ছাদ-বারান্দায় পড়ে থাকা পাত্র, ফুলের টব, পানির ট্যাংক এবং জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। ভবনের আড়ালে বা দুই ভবনের মধ্যবর্তী স্থানও প্রজননক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। এসব জায়গা অনেক সময় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযানের বাইরে থাকে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকার সচেতনতামূলক কর্মসূচি, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ এবং সরকারি হাসপাতালে শয্যা, পরীক্ষার কিট ও স্যালাইনের সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর এ বিষয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নিয়মিত লার্ভিসাইডিং, ফগিং, লার্ভা ধ্বংস এবং মশার প্রজননক্ষেত্র ও হটস্পট চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিচ্ছে। পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জনসচেতনতামূলক র্যালি এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে। ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, জনসচেতনতা বাড়াতে বিএনসিসি ও বাংলাদেশ স্কাউটের সদস্যদের যুক্ত করা হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ৭৫টি ওয়ার্ডকে ১০টি অঞ্চলে ভাগ করে সমন্বিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালাচ্ছে। প্রতি শনিবার বিশেষ অভিযান চালিয়ে আগামী তিন মাস কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সংস্থাটির বর্ষা-পূর্ব জরিপে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিকে ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন বলেছেন, শুধু ফগার মেশিনের ধোঁয়া ছড়ানো বা মৌসুমি পরিদর্শন করে জরিমানা আদায় যথেষ্ট নয়। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত গাড়ি, ছাদে জমে থাকা পানি, খোলা ড্রাম, ফুলের টব ও ভাঙা পাত্রে নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিশ্বের ৯৭টি দেশ ও অঞ্চলে ২২ লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ, বৃষ্টিপাতের ধরন ও এডিস মশার প্রজনন পরিস্থিতি ডেঙ্গুর বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞরা সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বাসাবাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, পানির পাত্র পরিষ্কার রাখা এবং বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি অপসারণের মাধ্যমে এডিস মশার বংশবিস্তার কমানো সম্ভব বলে তারা মনে করেন।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)





মন্তব্য করুন